All posts by lutfor

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন আতঙ্ক!

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী মাইন পেতে রাখছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখা নিষিদ্ধ।

মিয়ানমার সরকার সে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে নিজেদের জড়াচ্ছে।
সীমান্তে পুঁতে রাখা বোমার (ইমপ্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি) কারণে গণহত্যার কবল থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসা রোহিঙ্গারা প্রাণ হারাচ্ছে। নিরাপদ নয় সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও।

এ ঘটনায় সীমান্ত জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। ইতোমধ্যে গত একসপ্তাহে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের আশারতলীর বড় শনখোলা, ঘুমধুম ইউনিয়নের ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার বাহিনীর পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে পাঁচজন রোহিঙ্গা ও একজন বাংলাদেশি মারা গেছে। আহত হয়েছে অর্ধশত মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দু’সপ্তাহ আগে সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদেরে বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ও সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত- নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের আশারতলী ও চাকঢালা সীমান্তের সাপমারাঝিরি বড় শনখোলা, নিকুঞ্জছড়ি, চেরারমাঠ, রাবারবাগান, প্রধানঝিরি এবং ফুলতলী- এই ছয় স্থানে অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ঘুমধুম, তুমব্রু, জলপাইতলী, রেজু, আমতলী, বাইশফাঁড়ীর পাশাপাশি দোছড়ি ইউনিয়নের লেম্বুছড়ি সীমান্তেও আশ্রয় নিয়েছে শত শত রোহিঙ্গা। প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ এখনো থেমে নেই। অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গারা যাতে ফের মিয়ানমারে প্রবেশ করতে না পারে- সে জন্য সীমান্তের শূন্যরেখায় মাইন পাতছে মিয়ানমার বাহিনী।

মানবাধিকার সংগঠন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাও বলছে, মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর নিষিদ্ধ এ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন পেতে রেখেছে বলে তারা প্রমাণ পেয়েছে। এ ধরনের মাইন যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু মানুষ নিধনের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা ট্যাংক-বিধ্বংসী মাইন থেকে আলাদা। মানুষের পায়ের চাপ পড়লেই মাটিতে পুঁতে রাখা এ মাইন বিস্ফোরিত হয়।

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের স্থানীয়রা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে ঘুমধুম থেকে আলীকদম সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশে সহস্রাধিক স্থলমাইন ও উচ্চ ক্ষমতার বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এসব মাইন বিস্ফোরণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল চৌধুরী বলেন, সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে নাইক্ষ্যংছড়ির আদর্শগ্রামের বাসিন্দা বদিউল আলমের ছেলে হাশিম উল্লাহ, মিয়ানমারের সৈয়দ আহমদ, মোক্তার আহমদ ও গোল চেহের বেগমসহ ছয় জন মৃত্যুবরণ করেছে। এই আতঙ্ক এখন সীমান্তের সাধারণ মানুষকেও ভোগাচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের মাইন স্থাপনের ঘটনায় বিজিবি কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানালেও এখনো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোন উত্তর নেয়নি। বরং নতুন নতুন এলাকায় শত শত স্থলমাইন পাতছে সে দেশের সেনাবাহিনী। এরই মধ্যে মৃত্যুর চরম ঝুঁকি নিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে এখনো ঢুকছে শত শত রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানান, ওপারে নিবর্বিচারে গুলি ও রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার পাশাপাশি সীমান্তে মাইন পুঁতে নতুন কৌশলে রোহিঙ্গা দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনী। নির্যাতন সইতে না পেরে এপারে পালিয়ে এসেও রক্ষা পাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। কাঁটাতারের পাশে শত শত স্থলমাইন ও বিস্ফোরক থাকা সত্ত্বেও জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে। অন্যদিকে প্রতিনিয়িত মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গা ও সীমান্তের বাসিন্দারা।

চাকঢালা সীমান্তের বড় শনখোলায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নুর মুহাম্মদ বলেন, সীমান্তে শুধু কাঁটাতারের বেড়া নয়, যেসব জায়গা দিয়ে মানুষ চলাচল করে এবং রোহিঙ্গারা যেসব রাস্তা ধরে বাংলাদেশে আসছে সেসব জায়গাগুলোতে মাইন ও বিস্ফোরক পুঁতে রাখা হয়েছে।

ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্তে আশ্রয় নেয়া মাইন বিস্ফোরণে আহত- মিয়ানমারের ফকিরা বাজার এলাকার রোহিঙ্গা আক্তার আহম্মদ জানান, মাইন বিস্ফোরণে যারা আহত হচ্ছে তাদের শরীরের বেশিরভাগই উড়ে যায়। বিস্ফোরকে আহতরা মারা না গেলেও পঙ্গু হয়ে যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুধু এখন নয় এর আগেও দু’দেশের শূন্যরেখায় অসংখ্য মাইন পুঁতেছে। রাঁতের আধারে এমনকি টহলের সময়ে তারা দল বেঁধে মাইন পাতছে। দূর থেকে মাইন পুঁতে রাখার দৃশ্য দেখা গেলেও ভয়ে কাছে কেউ যায় না।

ঢেকুবনিয়া এলাকার জনপ্রতিনিধি নুর মোহাম্মদ বলেন, আগে নাসাকা ক্যাম্পগুলোতে বিস্ফোরক বানানো হতো। এখন এসব আরও উন্নত করা হয়েছে। এ কারণে হতাহতের ঘটনাও বেশি ঘটছে।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, শূন্যরেখায় বিপুল সংখ্যক মাইন থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবারসহ এপারে আসছে। আশ্রয় শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গা সুযোগ বুঝে তাদের বাসা বাড়িতে ফিরতে গিয়ে মাইনে আহত হচ্ছে। এছাড়া গরু-ছাগল ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িতরা লোভে পড়ে জিরো লাইনে কাটা তারের বেড়া অতিক্রম করতে গিয়ে বিস্ফোরণে আহত হচ্ছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে তৈরি বিস্ফোরককে ইমপ্রোভাইজ এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বলা হয়ে থাকে। এগুলো বাঁশ বা লোহার নলের ভেতর বিস্ফোরক ঢুকিয়ে, তার জোড়া দিয়ে বানানো হয়। অনেকটা মাইনের আদলে। এতে পা পড়লে বা আঘাত লাগলে তা বিস্ফোরিত হয়। অপর দিকে চীন ও রাশিয়ার তৈরি কিছু এন্টি পারসোনাল মাইন বা স্থলমাইনও মাটিতে পুঁতে রাখা হচ্ছে।

বিজিবি কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার ও নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো.আনোয়ারুল আযীম বলেন, যেহেতু ঘটনাগুলো সীমান্তের ওপারে ঘটছে- সে জন্য স্পষ্ট করে বলতে পারছি না, এসব মাইন না বিস্ফোরক। তবে লোকজন আহত ও নিহত হওয়ায় এগুলো যে উচ্চ ক্ষমতার বিস্ফোরক তা বুঝা যাচ্ছে। বিজিবির পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত চার বার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার বাহিনীর সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য-৯০ এর দশকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন সীমান্তে স্থলমাইন বসায়। পরে রোহিঙ্গা সমস্যা বাড়লে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় সেদেশের সেনাবাহিনী স্থলমাইন বসায়। এসব মাইন অপসারণে দু’দেশের বাহিনী বেশ কিছু অভিযানও পরিচালনা করেছে। তবে সীমান্ত সমস্যার কারণে মাইন অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়াচ্ছে সেনাবাহিনী : অ্যামনেষ্টি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে তার অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে।

স্যাটেলাইট থেকে তোলা রাখাইন রাজ্যের অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেষ্টি বলছে, সেখানে গত তিন সপ্তাহে আশিটিরও বেশি স্থানে বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো এই কাজ করছে বলে অ্যামনেষ্টি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের পোড়ামাটি নীতির ওপর সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করে যে রিপোর্ট দিয়েছে তা পড়লে বেশ বিচলিত হতে হয়।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবি, স্যাটেলাইটে আগুন সনাক্ত করতে পারে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং ঐ অঞ্চল থেকে পাওয়া ছবি ও মানুষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি দেখতে পেয়েছে যে গত ২৫শে অগাস্টের পর থেকে মোট ৮০টি জায়গায় ব্যাপক মাত্রায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে এমন সংঘবদ্ধ দলগুলো একসাথে মিলে এই জ্বালাও পোড়াও চালাচ্ছে।

তারা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং পলায়নপর মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে।

অ্যামনেস্টির একজন কর্মকর্তা তারানা হাসান বলছেন, তার ভাষায়, এটা পরিষ্কার যে সুপরিকল্পিতভাবে এসব সহিংসতা চালানো হচ্ছে। প্রমাণ হিসেবে অ্যামনেস্টি বলছে, যেসব জায়গায় আগুন দেয়া হয়েছে সেই জায়গাগুলোর আগের চার বছরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে তারা কোন অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেখতে পাননি। বেছে বেছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতেই আগুন দেয়া হয়েছে।

যেসব গ্রামে রোহিঙ্গা এবং রাখাইনরা পাশাপাশি বাস করে, সেখানে রাখাইন বাড়িগুলো আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে বলে অ্যামনেস্টি এই রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।

ওদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কট নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আজ আরো একদফা বেড়েছে।

লন্ডন সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্মী বাহিনীর সহিংসতা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং অবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে।

মি. টিলারসন বলেছেন, অং সান সুচি যে কঠিন এবং জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটা আমরা বুঝতে পারছি। জাতিগত পরিচয়ে বাইরে গিয়ে মানুষের সাথে আচরণ কী হবে আমরা সবাই সেটা জানি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাই সমর্থন করে। কিন্তু এই সহিংসতা অবশ্যই থামাতে হবে, মানুষের ওপর এই নির্যাতন থামাতেই হবে। অনেকেই বলছেন এটা জাতিসত্তা নির্মূলের ঘটনা, একেও থামাতে হবে বলে মি. টিলারসন উল্লেখ করেন।

লন্ডনে এই সংবাদ সম্মেলনে মি. টিলারসনের পাশে ছিলেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে মিয়ানমারের প্রকৃত ক্ষমতাধর নেতা অং সান সুচিকেই তার নৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অং সান সুচি যেসব মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, যেভাবে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, সেই জন্য তার প্রতি আমার প্রশংসা কারো কথায় কমে যাবে না। আমি জানি বিশ্বব্যাপী বহু মানুষও একইভাবে তার গুণমুগ্ধ। কিন্তু রাখাইনের মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য মিস সুচিকে এখন তার নৈতিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করতে হবে বলে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

চলছে রোহিঙ্গা-বাঙালি বিয়ের হিড়িক!

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিয়ের মাধ্যমে বাঙালি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের নানা জায়গায় এমন ঘটনা এখন নিত্যদিনের।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, আত্মীয়তার মধ্য দিয়ে শরণার্থী হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল যে হারে বাড়ছে তাতে তারা বাঙালিদের সঙ্গে মিশে ভবিষ্যতে এ এলাকায় শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যার প্রভাব পড়তে পারে সুদুরপ্রসারী।

বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া অনেক রোহিঙ্গার মধ্যে রহিম অন্যতম। সাহেনা বেগম নামে কক্সবাজারের এক নারীকে বিয়ে করেছেন মিয়ানমার থেকে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা রহিম।

সেই রহিম জানালেন, বাংলাদেশই তার কাছে সব। তিনি আর মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান না। খবর চ্যানেল আই অনলাইনের।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগে থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গা রহিমের ঘরের অর্ধেকটায় জায়গা পেয়েছে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে দেশটি থেকে পালিয়ে আসা আরেকটি রোহিঙ্গা পরিবার। এখন এ ঘরের মোট ১২ জন সদস্যের মধ্যে ৯ জনই রোহিঙ্গা। নতুন আসা রোহিঙ্গা পরিবারও চায় বাঙালি কারও সাথে আত্মীয়তা করতে।

উখিয়ার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সেখানে বাঙালি আর রোহিঙ্গার মধ্যে বিয়ে এখন হরহামেশাই হচ্ছে। রহিমের পাশেই জমিরণের বাড়ি। তার স্বামীও একজন রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা আর বাঙালির মধ্যেকার এই বিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। বাঙালি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সাম্প্রতিক বেশ কিছু বিবাদের উদাহরণ টেনে তারা বললেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গারা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে নিজেদের শেকড় শক্ত করতে চাইছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা পুরনো এবং নতুন মিলে যে সংখ্যাক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিচ্ছে তাদের যদি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হয় ভবিষ্যতে এ এলাকায় বাঙালি এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে বড় ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

১৭৬টি গ্রাম রোহিঙ্গাশূন্য করা হয়েছে: মিয়ানমার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ১৭৬টি গ্রাম এখন জনমানবশূন্য। সেনাবাহিনীর চলমান অভিযানে গ্রামগুলো থেকে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা পালিয়ে গেছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মুখপাত্র জ হতয় এক বিবৃতেত এসব তথ্য জানিয়েছেন। খবর: দ্য গার্ডিয়ানের। জ হতয় বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের তিনটি শহরতলী এলাকায় সর্বমোট ৪৭১টি গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামকে লক্ষ্য করে সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৭৬টি বা ৪০ শতাংশ গ্রাম থেকে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছে সেনারা। সেগুলো এখন জনমানবশূন্য।’

তিনি বলেন, ‘অন্য ৩৪টি গ্রাম থেকেও কিছু কিছু রোহিঙ্গা পালিয়েছে। সেগুলোর দখল নেওয়া হচ্ছে। এসব গ্রামের মানুষেরা দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে গেছে।’

তবে বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করেননি জ হতয়।
তীব্র সমালোচনার মুখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি যাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

এরই মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মুখপাত্র রোহিঙ্গাদের গ্রামশূন্য করার তথ্য দিয়ে বললেন, ‘সু চি সম্ভবত জাতিসংঘের অধিবেশন এড়াতে চাচ্ছেন।’

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের অন্তত ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনাক্যাম্পে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।

ইতোমধ্যে এই সংঘর্ষে ৩ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
আর জাতিসংঘের তথ্যে, প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে এখন পর্যন্ত পালিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
বাংলাদেশ এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

তবে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া বাসিন্দারা মিয়ানমারে ফিরতে চাইলে অবশ্যই সবাইকে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হবে না। যাচাই-বাছাই করতে হবে। এরপরই মিয়ানমার কেবল তাদের গ্রহণ করতে পারে।’
রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তিনটি কারণও উল্লেখ করেন জ হতয়।

তিনি বলেন, ‘প্রথমত, অবশ্যই রাখাইনের সন্ত্রাসী হামলা। দ্বিতীয়ত, সেখানকার মানুষেরা আরও অন্য এলাকায় বিদ্রোহ বাড়াচ্ছিল। আর তৃতীয়ত, আমরা রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার। এজন্য যারা চলে যাচ্ছে, তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই দেখছি। সেভাবেই ইস্যুটিকে মোকাবেলার চেষ্টা করছি।’

বর্মি বাহিনীর প্রথম টার্গেট আলেম ও হাফেজ

মিয়ানমারের বুচিডংয়ের মনুপাড়ার খবির উদ্দিনের বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই। এই বয়সে ছেলেসন্তান সব হারিয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে একজন শেখ আহম্মেদ আলী ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেজ। আর নুরুল হাকিম ছিলেন আরবি শিক্ষিত মৌলভী। এই দুই সন্তানের কী অবস্থা জানেন না খবির উদ্দিন। শুধু দেখেছেন বর্মি বাহিনী ও মগরা তাদের ধরে নিয়ে গেছে। খবির উদ্দিন বলেন, বর্মি বাহিনী ও মগদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে সেখানকার হাফেজ এবং আলেমদের হত্যা করা। খবির উদ্দিন নিজের চোখে অন্তত পাঁচজন আলেমকে গলা কেটে ও গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন।

১৩ দিন হেঁটে গতকাল বুধবার খবির উদ্দিন পরিবারের অবশিষ্ট আট সদস্যকে নিয়ে পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে পৌঁছেন। গতকাল সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখা যায় খবির উদ্দিনকে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই ছেলেকে তার চোখের সামনে থেকে ধরে নিয়ে গেছে। পরিবারের নারী ও শিশু ছাড়া কেউ আর বেঁচে নেই। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালেও মগদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিছু দিন পরে বাপদাদার ভিটেমাটিতে চলে গেছেন।
কিন্তু এবারের মতো করুণ পরিস্থিতি আর কোনো দিন দেখেননি। তিনি বলেন, এই বয়সে এসে ছেলেসন্তান হারিয়ে তাকে নিঃস্ব হতে হবে কোনো দিন চিন্তাও করেননি। চোখের সামনে দেখেছেন কিভাবে শত শত মানুষকে বর্মি বাহিনী ও মগরা হত্যা করেছে। পথে আসার সময় এক বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনে ভেতরে তাকিয়ে দেখেন মাস ছয়েকের একটি শিশু রক্তের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। পাশে পড়ে আছে নারী-পুরুষ এবং আরো কয়েকটি শিশুর লাশ।
ওই শিশুটিকে খবির উদ্দিন নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। এ দিকে সেখানকার আলেমদের হত্যার ব্যাপারে আরো অনেক রোহিঙ্গার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। মৌলভী ইউসুফ নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, তার ওস্তাত (শিক্ষক) তম্রু কোয়াইংচিবং মাদরাসার মাওলানা নুর আহম্মেদকে নামাজরত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। তার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছে বর্মি বাহিনী ও মগরা। মৌলভী ইউসুফ বলেন, কোনো আলেম ওলামাকে তারা আর বাঁচিয়ে রাখেনি। কোনো কোনো আলেমকে হাত-পা কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে।
সব রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে চলে আসবে!
মিয়ানমারের রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে শরণার্থীর সংখ্যা এক মিলিয়ন বা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ।
ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাই কমিশনার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলছে, চলতি সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিক হতে পারে এটাই যে, মিয়ানমার থেকে সব রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে চলে আসতে পারে। সংস্থা দুটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো দ্রুততার সাথে সহায়তায় এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার একজন পরিচালক মোহাম্মেদ আবদেকার মোহামুদ ও ইউএনএইচসিআর -এর সহকারী হাই কমিশনার জর্জ অকোথ অব্বুর নেতৃত্বাধীন যৌথ দল সম্প্রতি কক্সবাজারে শরণার্থী পরিস্থিতি দেখে এসেছেন।
বৃহস্পতিবার ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেছেন, শরণার্থী সংখ্যা এখন চার লাখ এবং প্রতিদিন ১০-২০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকছে। নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিচ্ছে ১০-২০ হাজার করে রোহিঙ্গা।
তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা সোজা করে বলেছেন, বাংলাদেশ গভীর মানবিক সঙ্কট মোকাবেলা করছে। একই সাথে তারা বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলেছেন নিজেদের অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
তারা বলেছেন, যে রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে তারা দুটো ধারণা করছেন- একটি হল যে পরিস্থিতি ভালো হবে যদি আর কেউ বাংলাদেশে না আসে, কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ বা খারাপ দিক যেটি হতে পারে তা হলো এমন অবস্থা চললে সব রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে চলে আসতে পারে।
ইউএনএইচসিআর -এর সহকারী হাই কমিশনার জর্জ অকোথ অব্বুর রীতিমত উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেছেন, মাত্র আড়াই সপ্তাহে চার লাখ রোহিঙ্গা এসেছে, এটা অনেক বড় একটি সংখ্যা। সে কারণেই এ বিষয়ে এখন অনেক কিছু করণীয় আছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বিপর্যয়কর মানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন।
রাখাইনে চলমান সহিংসতার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং সেখানে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে দেশটির কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে জাতিসঙ্ঘ।
এর আগে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ এক জরুরী বৈঠকে বসে। বৈঠকে নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সেখানে সেনা অভিযান বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়।
কিন্তু তাতে ঠিক কতটুকু সাড়া মিলছে?
জাতিসঙ্ঘের এই কর্মকর্তারা বলেছেন, যে সহায়তা আসছে তা মোটেও যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসা উচিত। কাল করবো, পরশু করবো এমন ভাবলে চলবে না, আজই করতে হবে, আজই এগিয়ে আসতে হবে সহায়তা নিয়ে। এখানকার সরকার ও জনগণ তাদের সাধ্যমত করছে কিন্তু এগিয়ে আসতে হবে বিশ্ব সম্প্রদায়কেই।
এই কর্মকর্তারা বলছেন, হুট করে এতো শরণার্থী বাংলাদেশে চলে আসবে সেটা শুরুতে তারা বুঝতে পারেননি। এখন অনেক কিছুই করতে হবে বলে মনে করেন তারা।
সেজন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় সুবিধা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। শরণার্থী সংখ্যা তিন লাখ হওয়ার পর জাতিসঙ্ঘ ৭৭ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার কথা বলেছিল এখন সেটি চার লাখ পার হওয়ায় এবং আরও বিপুল সংখ্যক শরণার্থী পথে থাকায় কী পরিমাণ সহায়তা লাগতে পারে সেটি নতুন করে নির্ধারণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
জাতিসঙ্ঘে আট লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী শনিবার নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। এই অধিবেশনে তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া নতুন চার লাখ এবং আগে থেকে থাকা চার লাখ, অর্থাৎ মোট আট লাখ রোহিঙ্গার জন্য মানবিক সহায়তা চাইবেন। প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন। সীমান্ত অভিমুখে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশের জন্য একটি সঙ্কট হয়ে দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়া উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এ সব কথা জানিয়েছেন। এতে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও অতিমাত্রায় বল প্রয়োগে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ গতকাল যে বিবৃতি দিয়েছে, বাংলাদেশ তাকে স্বাগত জানায়। নিরাপত্তা পরিষদের এ অবস্থান খুবই সময় উপযোগী ও দৃঢ়। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে এ ধরনেরই একটি অবস্থান আশা করছিল।
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে প্রস্তাব মিয়ানমার প্রত্যাখান করেছে – এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাহমুদ আলী বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলর অং সান সু চি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তার দফতরের একজন মন্ত্রীর সাথে নিউইয়র্কে আমার কথা হবে। সে সময় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থাকবে।
জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে যোগ দেয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে আবারো আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনুন : প্রধানমন্ত্রী

বাসস:প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনার আহবান জানিয়ে আজ বলেছেন যদি দুর্নীতিবাজ আর জঙ্গিবাদ সৃষ্টিকারী বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশ দুর্নীতিবাজদের দখলে চলে যাবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা দোয়া করবেন এবং আগামী নির্বাচনে- যে নির্বাচনই আসুক, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে নৌকার প্রার্থীকে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন। তাহলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।’ শেখ হাসিনা আজ রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান সুগার মিল মাঠে আওয়ামী লীগের বিশাল জনসভায় একথা বলেন।
ইনশাল্লাহ বাংলাদেশে কোনো দরিদ্র থাকবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকে ৫ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার ওপরে উঠে এসেছে। আজ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, আজ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বসভায় আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। কাজেই আপনাদের কাছে দোয়া চাই। আপনারা দোয়া করবেন এবং আগামী নির্বাচন- যে নির্বাচনই আসুক নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে নৌকার প্রার্থীতে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন। তাহলেই উন্নযনের ধারা অব্যাহত থাকবে। ঐ লুটেরা, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ যারা সৃষ্টি করেছে তারা ক্ষমতায় আসলে এই দেশ জঙ্গিবাদের দেশ হবে, সন্ত্রাসের দেশ হবে।
পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়াসিন আলীর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, রাজশাহীর সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, পররাষ্ট্র প্রতি মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।
প্রধানমন্ত্রী এদিনকার পূর্ব নির্ধারিত বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বর্ণনা দিয়ে রাজশাহীবাসীর কাছে খালি হাতে আসেননি উল্লেখ করে বলেন, ইতোমধ্যে পদ্মার ভাঙ্গন থেকে রাজশাহীকে রক্ষার জন্য বাঁধ আমরা নির্মাণ করে দিয়েছি। আরো যেসব অঞ্চল ভাঙ্গনপ্রবণ সেসব অঞ্চলেও যাতে ভাঙ্গন রোধ হয় তার প্রকল্পও আমরা হাতে নিয়েছি। তিনি বলেন, এবারে কোন কোন এলাকায় বন্যা হয়েছে এবং বৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা প্রত্যেকটি অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ রাস্থাঘাট পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছি। বন্যায় যত রাস্তা-ঘাট নষ্ট হয়েছে ইনশাল্লাহ সব আমরা মেরামত করে দেব।
সরকারের তৈরী করে দেয়া রাস্তা-ঘাট রক্ষণাবেক্ষণের আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু আমি বলবো, এগুলোর যেন রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। যে কাজগুলো তাঁর সরকার করে দিচ্ছে সেগুলো যেন ভালভাবে হয়, তার প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্য তিনি সকলের প্রতিও আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বৃষ্টি ভেঙ্গে জনগণের আগমনের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি জানি কিছুক্ষণ আগেও আজ এখানে মুসলধারে বৃষ্টি হয়েছে। আমি সারদাতে ছিলাম (পুলিশ একাডেমীতে) পাসিং আউট প্যারেডে তখনও বৃষ্টি। সেই কাদামাটি পায়ে মেখে আপনারা কষ্ট করে এই মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন, কষ্ট করে এসেছেন। তাই আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি শুধু এইটুকু বলবো, আপনাদের যে এই আন্তরিকতা, আমাদের আওয়ামী লীগের প্রতি আপনাদের যে সমর্থন এটা আমরা কখনো ভুলবো না। তাই রাজশাহীর মানুষের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যা যা করণীয়-আমরা তা করে যাব।
রাজশাহীতে কৃষি উৎপাদন বহুমুখীকরণে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এক সময়ে এখানে সুগার মিলসহ রাজশাহীর অনেক কিছু নষ্ট হয়ে পড়ে ছিল, এক সময় এই রাজশাহীতে শুধু আম, হলুদ, আদা ছাড়া কিছ্ইু হত না। এখন সেই রাজশাহীতে কৃষি উৎপাদন বহুমুখীকরণ করা হচ্ছে। আরো ব্যাপকভাবে শাক সবজী ফলমূল যাতে উৎপাদন হয়, মাছের উৎপাদন বাড়ে-সেই ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। প্রত্যেক এলাকার মজা পুকুরগুলো সংস্কার করা এবং সেখানে যাতে পানি থাকে তার ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। সমস্ত খালগুলো খনন ও পুনখনন করে জলাবদ্ধতা আমরা দূর করে দিচ্ছি। সার্বিকভাবে যত উন্নতি দরকার তা আমরা করে দেব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইতোমধ্যেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করে দেয়ার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাথে সাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষির ওপর যাতে আরো উন্নত গবেষণা হয়, তারজন্য যে সব ফ্যাকাল্টি রয়েছে, সেগুলোও আমরা আরো উন্নত করে দেব যেন কৃষির ওপর আরো গবেষণা হতে পারে। এই রাজশাহীতে গবাদি পশু, মৎস্য শাক সবজীর উৎপাদন বাড়িয়ে আমিষের অভাব যাতে দূর হয় তাঁর উদ্যোগও আমরা নেব। মঙ্গা দূর করায় সরকারের সাফল্যে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তত এইটুকু দাবি আমরা করতে পারি এই উত্তরবঙ্গে যে মঙ্গা ছিল, সেই মঙ্গা এখন আর নাই। আর কোনো দিন মঙ্গা আসবেও না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার বন্যার কারণে কোন কোন জায়গার ফসল নষ্ট হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই খাদ্য কেনা শুরু করেছি। প্রত্যেকটা মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করছি। নদী ভাঙ্গনের ফলে যাদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে, তাদেরকে ঘরবাড়ি আমরা তৈরী করে দেব। ইতোমধ্যে সেই তালিকাও করা শুরু হয়েছে। ঘরেরদোরে স্বাস্থ্যসেবাকে পৌঁছে দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং ৩০ প্রকারের ওষুধসহ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের প্রসংগও উল্লেখ করেন।
তিনি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের সরকারের অন্যান্য উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে আমরা উন্নত করছি।
তিনি বলেন, স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম আমরা করে দিচ্ছি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রজেক্টও দেয়া হচ্ছে -যেন ছেলেমেয়েরা তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তার ব্যবস্থাও তাঁর সরকার করেছে এবং এভাবেই দেশের উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের কাছে আমার একটাই আবেদন থাকবে, আওয়ামী লীগ আপনাদের সংগঠন। এই আওয়ামী লীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আপনাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আপনারা দেখেছেন যখন এই আওয়ামী লীগ এবং নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আসে, তখনই দেশের উন্নতি হয়। কিন্তু ঐ বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসলে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বাংলা ভাই সৃষ্টি হয়, মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এমনকি জনগণের টাকা, এতিম খানার টাকা- সেটাকাও তারা চুরি করে খায়। বিদেশে বিত্ত-বৈভব বানায়। এটাই তাদের চরিত্র যে-দেশের মানুষের সম্পদ লুঠ করে নিজেরা বিলাসবহুল জীবন যাপন করে।
তিনি সকলকে তাদের ছেলেমেয়ে যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে তারা কোথায় যায়, কারসঙ্গে মেশে, কী করে এ বিষয়ে যেন বিশেষ নজর রাখেন তার প্রতি অনুরোধ জানান। স্কুল কলেজে কোন শিক্ষার্থী অনেক দিন ধরে অনুপস্থিত কিনা তা লক্ষ্য রাখার জন্যও শিক্ষকদের প্রতি আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী। মাদকাশক্তি এবং জঙ্গিবাদ থেকে নিজ নিজ সন্তানদের দূরে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী অভিভাবকদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মত মেশার ও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের ছেলে-মেয়েরা বিপথে চলে গেল কিনা অভিভাবক-শিক্ষকদের অবশ্যই তা দেখতে হবে।’ এ সময় তিনি মসজিদের ইমামদের কাছে শান্তির ধর্ম ইসলামের মূলমর্মবানী জনগণের কাছে তুলে ধরার আহবান জানান।
১৫ আগস্টের বেদনাবিধূও অধ্যায় স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা শোক মানুষ সইতে পারে না। আর আমি ও আমার ছোট বোন (শেখ রেহানা) একই দিনে মা,বাবা, তিনটি ভাই ও ভাইদের স্ত্রী, চাচাসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হারিয়েও দেশে ফিরতে পারি নাই। আমাদের দেশে ফিরতে দেয়া হয় নাই। আর আমরা যখন বাংলাদেশে এসেছি সেই শোক ব্যথা বুকে নিয়েও আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। যার একটাই কারণ আমার বাবা চেয়েছিলেন বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। এদেশের দুঃখী মানুষ দু’বেলা পেট ভরে ভাত খাবে। দুঃখী মানুষ একটু উন্নত জীবন পাবে। তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, আপনারা ভোট ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন বলেই আপনাদের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। আমরা দারিদ্রের হার কমিয়ে এনেছি এবং বাংলাদেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি আপনাদের দোয়া চাই, সহযোগিতা চাই। আর আপনাদের মাঝে আমি ফিরে পেতে চাই আমার হারানো বাবার স্নেহ, মায়ের স্নেহ, হারানো ভায়ের স্নেহ। আপনারা শুধু দোয়া করবেন- যে গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন সেই দায়িত্ব যেন পালন করতে পারি। এ সময় বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হবার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করি না। শেখ হাসিনা বলেন, এই বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে ইনশাল্লাহ অধিষ্ঠিত করবো-ক্ষুধা মুক্ত, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবো এটাই হচ্ছে আমার প্রতিজ্ঞা।

আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ শ্রিংলার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে মিয়ানমার সরকারকে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ত্রাণ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এ মন্তব্য করেন। বিমানবন্দরে ভারতীয় ত্রাণ গ্রহণ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত সহকারী হাইকমিশনার অরুন্ধতী দাশসহ দুই দেশের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বেলা সোয়া একটার দিকে ভারতের ত্রাণবাহী উড়োজাহাজটি বিমানবন্দরে পৌঁছায়। ওই ত্রাণ ওবায়দুল কাদেরের কাছে হস্তান্তর করেন ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

ত্রাণ হস্তান্তরের সময় বিমানবন্দরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভারত আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের কঠিন সময়ে আমাদের পাশে আবার দাঁড়িয়েছে।’

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা চার লাখ অতিক্রম করেছে। আরও অনেক শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। এমন কঠিন সময়ের মধ্যে ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছে। এ জন্য নরেন্দ্র মোদি সরকারকে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অভিনন্দন জানাই।’

ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সরকারের অবস্থান আমরা সমর্থন করি না। আমরা মিয়ানমার সরকারকে দ্রুত কফি আনান কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছি। এই পরিস্থিতিতে আমরা রাখাইন রাজ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যাতে রাজ্যের সব নাগরিক সমানভাবে উপকৃত হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চাই।’

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা আরও বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আপনাদের (বাংলাদেশ) দেশে এসেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষকে (রোহিঙ্গা) যেকোনো পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়। এমন কিছু লক্ষণও দেখছি। কেউ কেউ এই সুযোগে তাদের কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাস উসকে দিতে পারে। আমাদের দেশ (ভারত) সন্ত্রাসে মদদ না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর নীতি বজায় রেখেছে। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি।’

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের (বাংলাদেশ ও ভারত) বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় ভারত সরকার সাত হাজার টন ত্রাণসহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারই অংশ হিসেবে আজ ৫৩ টন ত্রাণের প্রথম চালান এল। এ রকম আরও একটি উড়োজাহাজে ত্রাণ আসবে। বাকি ত্রাণসামগ্রী ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হবে।

রোহিঙ্গাদের জন্য ভারতের পাঠানো ৫৩ টন ত্রাণের মধ্যে চাল, ডাল, চিনি, লবণ, বিস্কুট, দুধ, সাবানসহ বিভিন্ন সামগ্রী রয়েছে। এর আগে আজ সকাল সোয়া নয়টায় মরক্কো থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ত্রাণবাহী একটি উড়োজাহাজ চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। মরক্কো থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ১৪ টন ত্রাণের মধ্যে রয়েছে তাঁবু, কম্বল, ওষুধ, শিশুখাদ্য, ম্যাট্রেস ও চাল।

আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আরও দুটি ত্রাণবাহী কার্গো উড়োজাহাজ চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে বলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান (শিক্ষা) জানিয়েছেন।

ভারতীয় সীমান্তে বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ

লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তের ওপারে আজহার আলী (৩৫) নামে বাংলাদেশি এক রাখালের মরদেহ উদ্ধার করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএসএফের এক চিঠিতে স্থানীয়দের নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করে। নিহত আজহার আলী পাটগ্রাম উপজেলার রহমানপুর গাটিয়ারভিটা গ্রামের মইনুল হকের ছেলে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, আজহার আলীসহ একটি দল ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। পরে গরু নিয়ে ফেরার পথে ভারতীয় কুচবিহার-৬১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের বিএসবাড়ী ক্যাম্পের একটি টহল দল তাদের লক্ষ্য করে ককটেল ও পাথর নিক্ষেপ করে। এতে অন্যরা পালিয়ে আসলেও আজহার ঘটনাস্থলেই মারা যান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সানিয়াজান নদী থেকে আজহারের মরদেহটি উদ্ধার করে বিজিবিকে শনাক্তের আহ্বান জানায় বিএসএফ। পরে বিজিবি আজহারের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করে।

বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) লালমনিরহাট-১৫ ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফট্যানেন্ট কর্নেল গোলাম মোর্শেদ জানান, বিএসএফ আজহারের মরদেহটি উদ্ধার করে ভারতীয় পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্ত করার পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মরদেহ হস্তান্তর করবে তারা।

গরুর মাংসের প্যাকেটে ২৫ লাখ বৈদেশিক মুদ্রা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক যাত্রীর ব্যাগ থেকে ২৫ লাখেরও বেশি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে। দুবাইগামী যাত্রী নাম মো. ওসমানের কাছ থেকে মঙ্গলবার ভোরে এসব মুদ্রা জব্দ করা হয়। বাংলাদেশ বিমানের বিজি-০৪৭ ফ্লাইটে দুবাইয়ের উদ্দেশে আজ রওনা হওয়ার কথা ছিল ওসমানের।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান  বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই যাত্রীকে নজরদারিতে রাখা হয়। সোমবার রাতে ইমিগ্রেশন শেষে চেক-ইন কাউন্টারে (বোর্ডিং পয়েন্টে) তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ওসমান তার কাছে মুদ্রা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। এরপর তার কাপড়ের ব্যাগে থাকা সবজি ও গরুর মাংসের মধ্যে বিশেষভাবে প্যাকেটে মোড়ানো অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রাগুলো পাওয়া যায়।

জব্দকৃত বৈদেশিক মুদ্রার মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ১৫০ সৌদি রিয়াল, ১ হাজার ৫৮০ দিরহাম ও ১ হাজার ওমানের রিয়াল যা ২৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮০৪ টাকা সমমূল্যের।

ড. মইনুল খান আরো জানান, আটক যাত্রী স্বীকার করেন যে তিনি চোরাচালানি পণ্য কিনতে এই মুদ্রা অবৈধভাবে বহন করছিলেন। কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়া এগুলো বহন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও শুল্ক আইন বিরোধী। তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ঘর পোড়ানোর যন্ত্রণা অনুধাবন করতে পারি বলেই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। যতটুকু পারি আশ্রিতাদের সহযোগিতা দেব। তবে বিশ্ববাসীকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।’

মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এসব কথা বলেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এ ব্যাপারে জনমত গড়ে তোলার কথা জানান তিনি।

শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি, ঘরবাড়ি হারিয়ে আপনারা যারা এখানে এসেছেন তারা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। তবে আপনারা যেন নিজের দেশে ফিরে যেতে পারেন সে ব্যাপারে মিয়ানমারকে বলব।’

আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যেন কষ্ট না হয়, তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কেউ যেন ভাগ্য গড়তে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। বক্তব্য দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে তাতে কি তাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? একজনের ভুলে এভাবে লাখ লাখ মানুষ ঘরহারা হচ্ছে। আমরা শান্তি চাই।

এর আগে সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। এক ঘণ্টার মাথায় তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে সড়কপথে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে যান প্রধানমন্ত্রী।

সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, কক্সবাজার-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, মন্ত্রী পরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর সার্কিট হাউজে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতি শেষে চারটার আগে কক্সবাজার ত্যাগ করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।