সোমবার, ২৭শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

প্রশাসনের অভিযানে তারা ভীত নয় উখিয়া সীমান্তে ইটভাটায় জ্বলছে মাটি, পুড়ছে কাঠ, বিপন্ন পরিবেশ 

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯
news-image

বিজয় কুমার ধর, কক্সবাজার প্রতিনিধি : বর্তমান সরকারের সুশাসনে বিভিন্ন আইন কার্যকর করে শাস্তির আওতায় আনলেও ইটভাটা সংশ্লিষ্ট বা মালিকপক্ষের সম্পৃক্ত ইট ব্যবসায়ীরা ওইসব আইনের কোন তোয়াক্কাই করছে না। উপরুন্ত তারা বলে বেড়াচ্ছে প্রশাসনের অভিযানে তারা ভীত নয়। কারণ তারা সরকারি নিয়ম-নীতি ও প্রশাসনের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী ইটভাটা বাণিজ্য করে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম এলেই উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ির মাঝামাঝি এলাকায় ইটভাটা তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এসব ভাটা মালিকেরা চাষাবাদ উপযোগী জমি টপসয়েল ক্রয় করে ইট পোড়ানের কাজে ব্যবহার করার কারণে কৃষি নির্ভরশীল উখিয়া উপজেলার কৃষিপণ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে এমনটাই মনে করছেন পরিবেশবাদী সচেতন মহল। ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর থেকে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে স্থানীয়দের সার্বিকভাবে যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করছে ইটভাটাগুলি। কেননা ইট বাণিজ্যের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা একদিকে যেমন পাহাড় কাটছে, অন্যদিকে ধ্বংস করছে সবুজ প্রকৃতি। পাশাপাশি লোকালয়ে ইটভাটা তৈরি না করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা মানছে না। ঘন বসতি ও কৃষি পণ্য উৎপাদনে দৃশ্যমান এলাকা ঘুমধুমের বড়বিল থেকে হলদিয়া পাতাবাড়ি পর্যন্ত ঘুরলে দেখা যাবে ১৮/২০টি ইটভাটা থেকে কালো ধোয়া আকাশে উড়ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। উখিয়া হাসপাতালে কর্মরত উপ-সহকারি মেডিকেল অফিসার রহমত এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ইটভাটার কালো ধোয়া স্কুলপড়–য়া ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও বয়োবৃদ্ধদের শারিরীকভাবে মারাত্মক ক্ষতি করে। এজন্যই সরকার ইটভাটায় স্থাপন করা চিমনির উচ্চতা, প্রস্থতা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, পরিবেশ সম্মত এলাকা যেখানে সাধারণ মানুষ বসবাস করে, সেখানে ইটভাটা করা মোটেই উচিত নয়। ইটভাটা আইন ২০১৩ তে উল্লেখ আছে, ফসলি জমির মাটি, বনের কাঠ, ইট তৈরির কাজে শিশুদের ব্যবহার ও পাহাড় কাটা মাটি ব্যবহার করলে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। উখিয়ার সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন এর সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার জানান, উখিয়ার প্রায় ইটভাটাগুলি চলছে প্রশাসনের দয়ার উপরে। তা নাহলে এত অপরাধ, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বাস্থ্যহানীর মত জঘন্য কাজে লিপ্ত থাকা স্বত্তে¡ও এসব ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরেজমিন বেশ কয়েকটি ইটভাটা ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানতে চাওয়া হলে হলদিয়া পাতাবাড়ি গ্রামের শিক্ষানুরাগী নুরুল ইসলাম, কৃষক সালামত উল্লাহ ও ছাত্র অভিভাবক ইয়াকুব আলী জানান, ইটভাটার কারণে তারা সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইট সরবরাহ কাজে ব্যবহৃত ডাম্পার গাড়িগুলো গ্রামীণ সড়ক তছনছ করে দিচ্ছে। যা সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। তারা আরো বলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে মা-বাবা বা অভিভাবক আতংকে থাকে, কখন তার ছেলে বাড়ি ফিরবে। এছাড়াও ইট পরিবহনের সময় ধুলোবালির যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা বলছেন, এসব ইটভাটা গুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার আবু মাসুদ ছিদ্দিকী জানান, ইটভাটা মালিকেরা সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে কৃষি জমির টপ সয়েল গুলো মোটা অংকের টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য। তিনি বলেন, এমনও জমি আছে টপ সয়েল ক্রয়ের ফলে ওই জমি অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ার কারণে সেখানে পানি জমে থাকে। যে কারণে ওইসব জমিতে চাষাবাদ ও সবজি পণ্য উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভ‚মি) মো: আমিমুল এহছান খান জানান, উখিয়ার দুইটি ইটভাটায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ইটভাটার কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছিল তারা নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করছে না। ঝিকঝাক নাম ব্যবহার করে ইটভাটা পরিচালনা করলেও তারা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে উপরুন্ত ইট ক্রেতাদের ঠকাচ্ছে বিভিন্নভাবে। তাই বিভিন্ন অপরাধে দুইটি ইটভাটাকে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার টাকা করে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ক্রমান্বয়ে সবগুলো ইটভাটায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হবে।