মঙ্গলবার, ২২শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

নিরাপদ সীমান্ত চাই

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

রুমীন ফারহানা : কিছুদিন আগে ওভালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০১৭-এর ফাইনালে খেললো ভারত-পাকিস্তান। খেলা তেমন ভালো বুঝি না কিন্তু খেলা নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ভালোই উপভোগ করি। সদ্য সমাপ্ত এই খেলাটি নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ভারত বনাম পাকিস্তান বলে কথা। বাংলাদেশ ছাড়া আর যে অল্প কিছু দেশের খেলা থাকলে সাধারণত মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করি, তার অন্যতম হলো ভারত। ভৌগলিক দিক থেকে বিশাল এই দেশটির প্রায় পেটের ভেতরে অবস্থান বাংলাদেশের। মোটা দাগে ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত কিছু মিলও আছে দেশ দু’টির মধ্যে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান চিরকাল এদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। জনবহুল অথচ দরিদ্র এই দেশটি যুদ্ধরত বাংলাদেশকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, শরণার্থী শিবির খোলা থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য প্রচারণাসহ নানাভাবে সাহায্য করেছে। অবশ্য ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল নিছকই পাকভারত যুদ্ধ। ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর সম্প্রতি বিষয়টি পরিষ্কারও করেছেন। তিনি বলেছেন ‘লঙ্কা জয় করে রাম যেমন তা বিভীষণকে দিয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভারত তাই করেছে।’ যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যেকোনও কথায় যারা ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানি খুঁজে পান, তাদের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনও বক্তব্য শুনিনি।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের। যা ভেবেই ভারত তখন সাহায্য করে থাকুক না কেন, সাহায্য যে করেছিল, সেটাই ঐতিহাসিক সত্য। আমরাও এজন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু তারপরও ভারতের যেকোনও পরাজয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে অভিব্যক্তি আমি লক্ষ করি, তা বিস্ময়কর। ভারতের সঙ্গে কে জিতল, সেটি বড় কথা নয়, শুধু ভারতের পরাজয়টাই এদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের জয়ের তৃপ্তি এনে দেয়। অনেকেই বলবেন, খেলা তো খেলাই। খেলায় একটি দলকে সমর্থন বা অসমর্থন দিয়ে পুরো দেশের মনোভাব বোঝার চেষ্টা ঠিক নয়। কিন্তু এই খেলাকে উপলক্ষ করে মানুষ যে ভাষায় তার মনের ভাব প্রকাশ করে, সেটাকে কেবলই একটি ক্রিকেট দলের প্রতি বিরাগ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো—সিএনএন, আইবিএন ও দ্য হিন্দু পরিচালিত একটি জরিপে উঠে এসেছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ মানুষ মনে করে পৃথিবীর আর সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশই তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের দেশে এমন কোনও জরিপ কখনও হয়েছে কিনা, জানা নেই। তবে সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দের অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের কথায়, লেখায় ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে; যেখানে মন খুলে মনের কথা প্রকাশ করে মানুষ। কিন্তু কেন এই বিরূপ মনোভাব? কাঁটাতারের বেড়া? সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ হত্যা? কাঁটাতারে ঝোলানো ফেলানীর লাশ? তিস্তার পানি? অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি? বাণিজ্য বৈষম্য? পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল? সাংস্কৃতিক আগ্রাসন? বাংলাদেশের বাজার দখল? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ? একতরফাভাবে বাংলাদেশ থেকে যা কিছু সম্ভব/অসম্ভব তা বাগিয়ে নেওয়া? নাকি এর সবই?

বিভিন্ন ধরনের অন্যায্যতা ছাপিয়ে ঘোষিত এই বন্ধু রাষ্ট্রটির নির্মমতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো কারণে কিংবা অকারণে কখনও গুলি করে, কখনও স্রেফ পিটিয়ে, অত্যাচার করে সাধারণ, নিরস্ত্র ও অনেক ক্ষেত্রেই নিরপরাধ বাংলাদেশিকে হত্যা করা। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতে গত এক দশকে প্রায় হাজার খানেক বাংলাদেশি বিএসএফের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র কিংবা অধিকারের পরিসংখ্যানও তাই বলে। বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এখন দক্ষিণ এশিয়ার বধ্যভূমি। যদিও এ সব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকে কখনোই যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কেবল পরিসংখ্যান ছাপিয়ে তাদের দায় সেরেছে।
এমনকী ঈদের মাত্র ৫/৬ দিন আগে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোসালপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সপ্তম ও নবম শ্রেণিতে পড়া দুই কিশোর মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর আগের তাদের তীব্র শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে দাবি পরিবারের। ঠিক কী অপরাধে এই দুই কিশোরের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো, সেটা নিয়ে অবশ্য কেউই তেমন উদ্বিগ্ন নয়। বিজিবির প্রধান কাজ এখন পতাকা বৈঠক শেষে লাশ নিয়ে আসা, সেটি তারা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে। মজার বিষয় হলো ভারত থেকেও কিন্তু প্রচুর মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই সঙ্গে আসে গাঁজা, ফেনসিডিল, অবৈধ অস্ত্রসহ বহুকিছু। তবে বিএসএফ বাংলাদেশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে যেমন স্যুট অন সাইট বা দেখা মাত্র ঠাণ্ডা মাথায় গুলিনীতিতে চলে তেমন কিন্তু নিজের দেশের অপরাধিদের ক্ষেত্রে কিংবা বিজিবিকে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

নেপালের এক গোবিন্দ গৌতমের লাশ ভারতের কাছে যত ভারি হয়ে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশের হাজার খানেক লাশের মিছিল তার কানাকড়িও করতে পারেনি। গোবিন্দকে শুধু শহীদই ঘোষণা করা হয়নি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। কারণ গোবিন্দ গৌতমের পাশে পুরো নেপাল দাঁড়িয়েছিল, বাংলাদেশ যা কোনও ক্ষেত্রেই করেনি। এমনকী ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ২১ বিএসএফের একটি দল দুর্গাপুরে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে প্রায় ৫০০ গজ ঢুকে পড়ে ও নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। বিএসএফ সদস্যরা গ্রামবাসীর গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে যায়। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরার অপরাধে বহু নিরীহ মানুষকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। এর কোনোটিরই কোনও বিচার না বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, না ভারত কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে।

সম্প্রতি দেখলাম, দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সিসি ক্যামেরা, ফ্লাশলাইট বসাতে গেলে বাধা দেয় বিএসএফ। এমনকী ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করা হয়। বাধা দেওয়ার কারণ হলো ভারতের দিকে তাক করে ক্যামেরা ও ফ্লাশলাইট বসানো হচ্ছে। শেষপর্যন্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যে পাচার, চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র, মাদক বন্ধে সীমান্তে এত সাবধানতা, এত মানুষের মৃত্যু সিসি ক্যামেরা বা ফ্লাশলাইট তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়ক হতো। ঘটনাটি প্রমাণ করে বাংলাদেশিদের বুকে গুলি তাক করা যতটা সহজ ও স্বাভাবিক ভারতের দিকে ক্যামেরা পর্যন্ত তাক করা ঠিক ততটাই কঠিন ও অসম্ভব।

যে কোনও অন্যায়, অন্যায্যতা, অবৈধতা আর বৈষম্যকে বিনা প্রতিবাদে ক্রমাগত মেনে নিতে থাকার একটাই অর্থ দাঁড়ায়। আর তা হলো এসব অন্যায়কে বৈধতা দান। দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের বৈধতা একটি ছোট দেশের সরকার নানা কারণেই তার বড় প্রতিবেশী দেশকে দিয়ে থাকে। বিশেষ করে বড় রাষ্ট্রটি যখন ছোট রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে, খোলাখুলিভাবে ক্ষমতাভোগের বা ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইতিহাস সাক্ষী—কোনও অন্যায়, অন্যায্যতাই শুভ পরিণাম বয়ে আনে না বিশেষত তাকে যদি বিনা প্রতিবাদে ন্যায্যতা দানের চেষ্টা করা হয়।

লেখক: সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি