All posts by lutfor

টাখনুর নিচে কাপড় থাকা অবস্থায় নামাজ পড়লে কি নামাজ ভেঙ্গে যাবে ?

জাকারিয়া হারুন : নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেয়া হবে। আর নামাজের মাধ্যমেই মুমিনের পরিচয় হয়। নামাজ পালনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো টাথনুর নিচে কাপড় থাকা অবস্থায় নামাজ পড়লে কি নামাজ ভেঙ্গে যাবে?

উত্তর : টাখনুর নিচে কাপড় পরা শরীয়তে নিষেধ। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,টাখনুর নিচের যে অংশ লুঙ্গী (ইত্যাদি) দ্বারা ঢাকা থাকবে তা জাহান্নামে যাবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৮৭)
আর নামাযের মধ্যে টাখনুর নিচে কাপড় থাকলে নামাজ ভাঙ্গবে না। তবে মাকরূহ হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,যে ব্যক্তি নামাযে অহঙ্কারবশতঃ নিজ কাপড় (পায়ের গিরার নিচে) ঝুলিয়ে রাখে, আল্লাহ তার জন্য ‘জান্নাত’ হালাল করবেন না এবং ‘জাহান্নামও’ হারাম করবেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬৩৭)

অতএব নামায ও নামাযের বাইরে সর্বাবস্থায় যেন পুরুষের কাপড় টাখনু গিরার উপরে থাকে সে ব্যাপারে যতœবান হওয়া অবশ্য কর্তব্য। ইমদাদুল আহকাম ৪/৩৩৬

নাইকো মামলায় অভিযোগ গঠন ১৬ আগস্ট

নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ১৬ অাগস্ট দিন ধার্য করেছেন আদালত। রোববার মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির দিন ধার্য দিনে আসামি পক্ষ অভিযোগ গঠন শুনানি পেছানোর জন্য সময়ের আবেদন করেন। ঢাকার ৯নং বিশেষ জজ আমিনুল ইসলাম সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে এ দিন ধার্য করেন।

মামলা বিবরণ সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুটি আবিষ্কৃত গ্যাস ফিল্ডকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। নাইকো রিসোর্সেস বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি অদক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বিনা টেন্ডারে এবং সরকারি নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে ছাতক ও ফেনী গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে সেখানে মজুদ ২৭৬২ বিসিএফ গ্যাসের মধ্য থেকে উত্তোলনযোগ্য ১৭৪৪ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলনের অবৈধ সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্রের ন্যূনতম ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করে তৎকালীন বিএনপি সরকার।

এ ঘটনায় ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন দুদকের সহকারী পরিচালক (বর্তমানে উপ-পরিচালক) মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার অপর আসামিরা হলেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহিদুল ইসলাম ও নাইকো রিসোর্সেস বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।

২০০৮ সালের ৫ মে তৎকালীন দুদকের সহকারী পরিচালক সাহিদুর রহমান খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং দুদকের ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রের অপর আসামিরা হলেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাবেক সচিব খন্দকার শাহিদুল ইসলাম, নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেড দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সি এম ইউছুফ হোসেন, বাপেক্সের সাবেক ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক কোম্পানি সচিব মো. শফিউর রহমান, ওয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সেলিম ভূঁইয়া।

সিলেটে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত

সিলেটে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৭। রোববার বেলা ১১টা ২৭ মিনিগটের দিকে সিলেট ও এর আশপাশের এলাকায় এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট থেকে ২৮৩ কিলোমিটার পূর্বে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায়।

সৌদিআরব এবার হাজিদের দিচ্ছে ডিজিটাল ছাতা, থাকছে বহুমাত্রিক সুবিধা (ভিডিও)

সাজ্জাদুল হক : বর্তমান যুগ ডিজিটাল ও স্মার্ট ডিভাইজের। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে একটু আরাম ও স্বস্তি এনে দিতে বিশ্বের নানা প্রান্তে বিজ্ঞানীরা নিরলশ গবেষণা করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি হজ মৌসুমে হাজিদের কষ্টো কমাতে এমনই এক স্মার্ট ছাতা আবিষ্কার করেছেন সৌদিআরবের এক বিজ্ঞানী। যা একই সাথে প্রখর রোদে ছায়া ও বাতাস দেবে। এছাড়াও পাওয়া যাবে জিপিএস সিস্টেমসহ বিভিন্ন ডিভাইজ চার্জ দেওয়ার সুবিধা।

মরুভূমির দেশ সৌদিআরবে ভৌগলিক কারণে সূর্যের তাপ তীব্র। চল্লিশ ডিগ্রির উপর এখানকার গড় তাপমাত্রা। হজের মৌসুমে লাখ লাখ হাজিদের ভিড়ে গরম বেড়ে যায় বহুগুণে। প্রচ- এ গরমে হাজিদের একটু স্বস্তি দিতে চেষ্টার কমতি নেই সৌদি কর্তৃপক্ষের। এবার হাজিদের কষ্টো কমাতে নতুন এক ধরনের ছাতা আবিষ্কার করেছেন দুই উদ্যোক্ততা। তীব্র রোদে শুধু ছায়া নয়, ফ্যানের বাতাসও দেবে এই ছাতা। ছাতার সাথেই যুক্ত আছে ছোট এই ফ্যান, আর বিদ্যুৎ সরবরাহ আসে সৌর প্যানেল থেকে।

এ প্রসঙ্গে স্মার্ট ছাতার উদ্ভাবক কামেল বাদাওয়ি বলেন, হাজিরা সাধারণত ছাতা ব্যবহার করে রোদ থেকে বাঁচার জন্য। আগে কেউ ভাবেনি ছায়া ছাড়া অন্যকোন সুবিধা পাওয়া যায় ছাতার মাধ্যমে। ফলে ছাতায় ফ্যান যুক্ত করার বিষয়টিকে আমরা খুব গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ আগামী ১২ বছর হজ মৌসুমে প্রচ- গরম পড়বে। আর সৌরবিদ্যুতের সুবিধার কোন শেষ নেই।
ফিলিস্তিনি সহকর্মী প্রকৌশলি মানাল দালদিসকে সাথে নিয়ে এইছাতা উদ্ভাবন করেছেন মক্কার বিজ্ঞানী কামেল বাদাওয়ি। গরমে আরাম দেওয়ার পাশাপাশি হাজিদের নিখোঁজ হওয়া ঠেকানোর প্রযুক্তি থাকছে এই ছাতায়। এর সাথে আরও যুক্ত থাকছে জিপিএস সিস্টেম। মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইজ চার্জ দেয়ার ব্যবস্থাও।

এ বিষয়ে প্রকৌশলি মানাল দালদিস বলেন, সোলার প্যানেলে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ জমা থাকবে ছাতার হাতলে। এতে ফ্যান, লাইট ও জিপিএসের জন্য আলাদা আলাদা সুইচ রাখা হয়েছে। জিপিএস চালু করলেই সহজে সঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন হাজিরা। একে অপরের অবস্থানও জানতে পারবেন।

বহুমাত্রিক কাজের এই ছাতায় যুক্ত করা হয়েছে বেশ কয়েকটি সোলার প্যানেল। দুই উদ্ভাবকের প্রত্যাশা শুধু হাজিদের মধ্যে নয়, এটিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও জনপ্রিয়তা পাবে এই ছাতা। -তথ্যসূত্র : টিবিএন২৪

গুলশান হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে নিহত অর্ধশতাধিক জঙ্গি (ভিডিও)

সাজ্জাদুল হক : হলি আর্টিজান হামলার পর দেশব্যাপি আইন শৃংখলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অর্ধশতাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছে। আইন শৃংখলাবাহিনী থেকে শুরু করে গণমাধ্যম সবার জন্যই গত বছরের ১লা জুলাই হলি আর্টিজানে হামলা ছিলো শিক্ষণীয়। দেশের ইতিহাসে প্রথম জিম্মি করার ঘটনা এবং একসাথে ১৭ বিদেশি হত্যা সব মিলিয়ে সেটি ছিল এক কালো অধ্যায়।
জঙ্গি নিয়ে অস্বস্তি কি কেটেছে বাংলাদেশের? এমন প্রশ্নের জবাবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থায় জঙ্গিবাদ থেকে সহজে মুক্তি মেলার সম্ভাবনা কম। তাই আইনশৃংখলা বাহিনীকে নিজেদের সক্ষমতার উৎকর্ষ সাধণ করতে হবে সময়ের সাথে।
হলি আর্টিজানের ঐ ঘটনার পর থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত ২০টির মতো অভিযান পরিচালনা করে র‍্যাব-পুলিশ। রাজধানীর কল্যানপুরে ৯ জঙ্গি নিহত হবার ঘটনা দিয়ে যার শুরু। এরপর নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম-এমন বিভিন্ন জেলায় অভিযানে নিহত হয় অর্ধশতাধিক জঙ্গি। মারা গেছে, নব্য জেএমবি নেতা তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহানসহ শীর্ষ অনেকেই। এসব সাফল্যের কথা বলে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে জঙ্গীরা এখন অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল শিকদারের মতে, জঙ্গিবাদের হুমকি শেষ হয়ে যায়নি। আর জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক পরিচালক হাবিব বলছেন, সাময়িক নিরাপদ মনে হলেও প্রস্তুত থাকতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, হলি আর্টিজানের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে জঙ্গিবাদ বিরোধী মনোভাব বেড়েছে। তাই জঙ্গিদের এখন সংগঠিত হওয়া খুব একটা সহজ হবে না। -তথ্যসূত্র : চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

 

প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে জঙ্গিরা

প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে জঙ্গিরা। বিশেষ করে পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তারা। ব্যবহার করছে নানা রকম অ্যাপস। এনক্রিপটেড হওয়ায় গ্রেফতারের পর জঙ্গিদের কাছে থাকা মোবাইল ফোনের এসব অ্যাপস থেকে আলাপচারিতা উদ্ধার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম দিকে জঙ্গিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করতো।

পরবর্তীতে তারা থ্রিমা, টেলিগ্রাম বা উইকারের মতো অ্যাপস ব্যবহার শুরু করে। এখন এসব ছাপিয়ে তারা আরও বেশি গোপনীয় অ্যাপস ব্যবহার করছে। গত বছর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গিদের ব্যবহৃত এসব অ্যাপস থেকে নানাভাবে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনার পর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গিদের আমরা কোণঠাসা করে ফেলেছি। জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গিরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আমরা নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্র জানায়, জঙ্গিরা প্রথম দিকে যোগাযোগের সাধারণ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করতো। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, তারা নিত্য নতুন প্রযুক্তি, বিশেষ করে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপস ব্যবহার করছে। এ কারণে তাদের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে ঢুকে গোপন তথ্য জানা কিছুটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জঙ্গি নেতারা কাউকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রথমে প্রযুক্তি বিষয়ক কিছু প্রশিক্ষণ করানো হয়। অ্যাপস চালানোর কলা-কৌশল এবং তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ফেসবুক ও টুইটার

সিটিটিসি’র একজন কর্মকর্তা জানান, প্রথমদিকে জঙ্গিরা যোগাযোগের জন্য ফেসবুকের মেসেঞ্জার অ্যাপস ব্যবহার করতো। এছাড়া টেলিগ্রামও প্রথমদিকে ব্যবহৃত হতো। সেকেন্ডারি মাধ্যম হিসেবে উইকার, সিওরস্পট ও পিটি নামের অ্যাপসগুলো ব্যবহার করতো। বর্তমানে জঙ্গিরা সিএস, কিক ও থ্রিমা অ্যাপস ব্যবহার করছে।

সিটির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জঙ্গিরা ভবিষ্যতে সাইলেন্ট সার্কেল, সিগন্যাল, চ্যাট সিকিউর, ওএস টেল ও রেডফোনের মতো সিক্রেট ম্যাসেঞ্জার ব্যবহার করতে পারে। জঙ্গিরা এসব যোগাযোগ অ্যাপস ব্যবহার করলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি হিসেবে আইটি এক্সপার্ট অনেক তরুণকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জঙ্গিরা টার্গেট করে আইটি এক্সপার্টদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। কারণ জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক এখন পুরোটাই আইটি নির্ভর। মোবাইল ফোনের সাধারণ ব্যবহারের চাইতে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকা। এজন্য আইটিতে এক্সপার্টরা সাধারণ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এমনকি প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনের আইটি শাখা নামে আলাদা একটি শাখাও রয়েছে।

উল্লেখ্য, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার সময় ভেতরে থাকা জঙ্গিরা প্রটেক্টেড টেক্সট নামে একটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাইরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। হলি আর্টিজান থেকে উদ্ধার হওয়া ৩০টি মোবাইল ফোন এফবিআই-এর ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে পরীক্ষার পর এই তথ্য জানতে পারে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

হলি আর্টিজান: ঘুম কি ভাঙলো?

তুষার আবদুল্লাহ : চমকে ওঠার দিন ছিল আজ। চমকে উঠেছিলেন উঁচুতলার মানুষেরা। সমাজে কর্কট রোগ দেখা দিয়েছে, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, খবরটিকে খবর হিসেবেই দেখছিলেন তারা। ভেবেছিলেন কর্কট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে কেবল নিচুতলার মানুষ। নিচের সমাজ। নিজেরা নিজেদের প্রবোধ দিয়ে বলছিলেন- তারা, তাদের সন্তানরা যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে সেখানে জঙ্গিবাদ নামের কর্কট রোগের প্রবেশ ঘটেনি। অথচ নিরব ঘাতক এই রোগটি তাদের অন্দরে গিয়ে নিরাপদ বসত গড়েছিল। এই রোগের উপসর্গের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না, এমন কথা বলা যাবে না। সবাই উপসর্গ ধরতে পেরেছিলেন। তবে ধারণা করে উঠতে পারেননি উপসর্গটি মরণব্যাধিতে রূপ নেবে। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সুশীল নামের ‘সেলোফিন পেপার’ আবৃত সমাজ একটি ধারণার প্রচারক ছিল-জঙ্গি মানেই ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থী। তাদেরই ধর্ম বিষয়ে কট্টর অবস্থান। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা সেই প্রচারপত্র বিলিকারকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। তারা বিব্রত হয়েছিলেন, হয়েছিলেন ভীত। কারণ জঙ্গি হামলায় জড়িতরা সমাজের উঁচুতলার সন্তান ছিল। তারকা খচিত ইংরেজি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তারা। বিদেশে শিক্ষারতও ছিল কেউ কেউ। বিশেষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও সন্দেহ করা হচ্ছিল। জঙ্গিরা হলি আর্টিজানে ওই রাতে যারা উপস্থিত ছিলেন- দেশি, বিদেশি তাদের ২২ জনকে হত্যা করেছে। ছেড়ে দিয়েছে কাউকে কাউকে। সেনা অভিযানের আগে বা অভিযানে জঙ্গিদের মৃত্যু ঘটেছে। এই জঙ্গিরা কারা তা কি লুকানোর একটি চেষ্টা ছিল? প্রাথমিক ভাবে তাদের যে নাম গুলো বলে পরিচয় দেওয়া হচ্ছিল তাতো সমাজকে আবার বিশ্বাস করে নিতে হতো। প্রয়াস ছিল ওই নিচুতলা থেকে অঙ্কুরিত জঙ্গিরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত।
সেই প্রয়াসকে নস্যাৎ করে দেন হলি আর্টিজান সংলগ্ন বাড়ি থেকে তোলা কোরিয়ান ভদ্রলোকের ছবি। ফেসবুকে সেই ছবি তুলে দিলে প্রকাশ হয় সমাজের উঁচুতলা আক্রান্ত কর্কটে। জঙ্গিদের মধ্যে যারা মারা গেছে তাদের নিয়েতো পরিবার বিব্রত ছিলই। যাদের মৃত্যু হয়েছে জঙ্গি হামলায় তাদেরও কাউকে কাউকে নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। যে তরুণরা সরে পড়তে পেরেছিল সেই রাতে বা ভোরে, প্রকাশিত ছবিতে তাদের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, তারাও উঁচুতলার। তাদেরকে কালোদাগ মুক্ত রাখতেও চলেছে সুশীল কৌশল ও রাজনীতি। কোনও কোনও গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়েছিল এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে। শুরুতে যে বলছিলাম চমকে যাওয়ার কথা। সেই চমকই অনেক সুপ্ত পরিবারকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা দেখতে পেলো-তাদের সন্তানেরা অনেকদিন পরিবার ছাড়া। তাদের কোনও হদিস নেই। কোনও কোনও পরিবারের সন্তানরা স্ত্রী, সন্তান, স্বামীসহ নিখোঁজ ছিলেন। এই নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়াদের খোঁজ পড়ে যায় হলি আর্টিজান হামলার পর থেকে। নিখোঁজদের যে তালিকা পাওয়া যায়, এবং কোনও কোনও নিখোঁজ যে ভিডিও চিত্র পাঠিয়েছিল-তারা সকলেই অভিজাত বা কথিত শিক্ষিত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। এই সময়টায় টেলিভিশনের টকশো, পত্রিকার কলামে শ্রেণি বৈষম্য, বৈষম্যমূলক শিক্ষা, শিক্ষার নৈতিকতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিস্তার পর দিস্তা আলোচনা হয়েছে। কৌতুককর বিষয় হচ্ছে সেই আলোচনায় উঁচুতলার প্রতিনিধিরাই অংশ নিয়েছেন। এই প্রয়াসে তাদের সাফাই গাইতে যেমন দেখা গেছে, তেমনি আলোচনা গুলোকে তারা আতঙ্ক কাটিয়ে উঠবার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যে কাজটি এই একবছরেও করা হয়নি- সেটি হলো আমাদের শিক্ষার ব্যবস্থার সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া। শিক্ষা যে সামাজিক বৈষম্য তৈরির আতুঁড় ঘর। সেই আতুঁড়টি ভেঙে ফেলা। একই সঙ্গে সমাজের যে শ্রেণিটির কাছে সুনামের মতো সম্পদ আছড়ে পড়ছে তাতে বাঁধ দেওয়া। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নৈতিকতার মোড়কে আগামী দিনের নেতা হিসেবে তৈরি করা।

এই পথে আমরা না এগিয়ে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে হেফাজতি ফুঁ দিয়ে বসলাম। আমাদের সন্তানরা হলি আর্টিজান দেখার পরেও মহল্লায় মহল্লায় গ্যাং তৈরি করতে শুরু করলো। মহল্লার দখল নিতে সমবয়সী প্রতিপক্ষকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে বসলো। আমরা ডুবে থাকলাম দেশে আইএস আছে আইএস নাই খেলাতে। একবছরের আমলনামা ঘাটলে দেখা যাবে আমরা শুধু সময়ের অপচয় করেছি। নিজেরা নিরাপত্তা ক্যামেরায় সেলফি তুলে নিরাপদ বলে ঢেকুঁড় তুলে গেছি মাত্র। অথচ আমাদের ভোগের বেহজম সমাজে, রাষ্ট্রে কর্কট রোগকে আরো গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা আছি ভোগের ঘুমে। সাম্প্রতিক ‘রেইনট্রি’ বিস্ফোরণও আমাদের সেই ঘুম ভাঙাতে পারেনি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

‘আগের চেয়ে ভালো’

গোলাম মোর্তোজা : ‘অমুক আমল ভালো ছিল’- ছোট বেলায় শুনেছি, নিশ্চয় অনেকেই শুনেছেন। যিনি বলেন তার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। যাবতীয় সংকট, দুঃখ- কষ্ট যেহেতু বর্তমান সময়েই মুখোমুখি হতে হয়, ফলে মানুষ ভাবতে ভালোবাসে যে অতীতটা ভালো ছিল। যে সময়টা চলে যায়, সেটাই ভালো মনে করে আনন্দ পায়। সত্যিটা যদিও তা নয়। বর্তমানটাই বাস্তব।
গত কিছু বছর ধরে শুনছি ‘আগের চেয়ে ভালো’! এ কথা দিয়ে আসলে কী বোঝানো হয়? ‘আগে’ মানে ‘কত আগে’? শায়েস্তা খাঁ’র আমল নিশ্চয়ই নয়। আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভবত ‘আগে’ বলতে ২০০১ থেকে ২০০৬’র বিএনপি- জামায়াত এবং ২০০৭-০৮ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালকে বোঝাচ্ছে। বা তার আগের অন্যান্য সরকারের সময়কেও বুঝিয়ে থাকতে পারে।
সেই সময়কালের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের দুই মেয়াদের গত আট সাড়ে আট বছরের সময়কাল নিয়ে কিছু তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে।
১. ‘আগে’র চেয়ে মানুষের আয় বেড়েছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বাজেটের আকার বিশাল হয়েছে। নতুন রাস্তা না হলেও, কিছু রাস্তা চারলেন হয়েছে, হচ্ছে, কিছু সেতু হয়েছে, পদ্মা সেতুসহ আরও কিছু ছোট- বড় সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে খাদ্য উৎপাদন। এসব ক্ষেত্রসহ নিশ্চয় আরও কিছু ক্ষেত্রে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, অন্য যেকোনও সরকারের যেকোনও কাজের চেয়ে ভালো কাজ।
২. আগে মোটা চালের কেজি ছিল ২২ টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাম বেড়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার কারণে। তখন মোটা চালের কেজি হয়েছিল ৩৬- ৪০ টাকা। ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারও নিয়ন্ত্রণে আসে। দেশে মোটা চালের কেজি নেমে আসে ২৬ টাকায়। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মোটা চালের কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে থাকে। ২০১৭ সালে এসে দাম বাড়তে বাড়তে ৫৫ টাকা হয়।
মোটা চাল ক্রেতাদের আয় ২০১৬ সালে যা ছিল, ২০১৭ সালেও তাই আছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৪ টাকা।
মধ্যবিত্তের আয় এবং চালের দামের হিসেবটাও এমনই। শুল্ক কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির পর দাম কেজিতে ৬ টাকা কমবে, জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ৫০-৫৫ টাকার চাল ৬ টাকা কমে হবে, ৪৬-৪৯ টাকা কেজি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ চালের দামের ক্ষেত্রে কী, তা বলার সুযোগ আছে!
২. চালের মজুদ ‘আগে’ থাকতো কমপক্ষে ৬ লাখ মেট্রিক টন। তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। চিত্রটা যে ‘আগের চেয়ে ভালো’ নয় বাজারই তো বলছে।
৩. খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এবার আমদানি করা চাল- গমের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এই খাদ্যমন্ত্রী ‘আগে’ পোকায় খাওয়া মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত গম আমদানি করেছিলেন। তার জন্যে কোনও শাস্তি পেতে হয়নি তাকে।
এবার যদি সত্যি পচা গম- চাল আমদানি করা না হয়, তাহলে বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’!
৪. বাংলাদেশে তো নয়ই, সারা পৃথিবীর কোথাও আজ পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়নি। বাংলাদেশে হচ্ছে। প্রতি কিলোমিটারে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ সাধারণ বিষয়!
যেখানে কিলোমিটার প্রতি ভারতে খরচ ১১-১৩ লাখ, চীনে ১৩-১৬ লাখ, ইউরোপ- উত্তর আমেরিকায় ৩৫ লাখ টাকা।
এত টাকা খরচ করে বাংলাদেশে ‘আগে’ কখনও রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি।
পদ্মাসেতুর বাজেট ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। এখন ২৮ হাজার কোটি টাকা। আরও কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মাসেতু। ৩৫০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার ১২৫০ কোটি টাকাতেও শেষ হচ্ছে না।
তবুও বলব ‘আগের চেয়ে ভালো’!

৩. ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, উৎপাদন ৭৫০০ থেকে ৮৫০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। পরিস্থিতি ‘আগের চেয়ে ভালো’।

দাম বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেওয়া লুটপাটের রেন্টাল- কুইক রেন্টাল নীতিতে চলেছে সরকার। তেলের দাম, ক্যাপাসিটি ট্যাক্স, অধিক মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা- সব ক্ষেত্রে নজীরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বিএনপি- জামায়াত সরকারের সময়ে ‘খাম্বা দুর্নীতি’ ছিল তুমুল আলোচিত- সমালোচিত বিষয়। রেন্টাল- কুইক রেন্টালের দুর্নীতির কাছে, যা কিছুই না।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৯ সাল থেকে কমতে শুরু করেছে। ২০০৭-০৮ সালে যে তেলের দাম ছিল ১২০ ডলার, ২০১৬ সালে তা ৩০ ডলারে নেমে এসেছিল। দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি। তেলের দাম কমার সুফল সরকার পেয়েছে, জনগণ পায়নি। সরকার আর জনগণ আলাদা হয়ে গেছে, অদ্ভুত শোনালেও অসত্য নয়।

উৎপাদন এবং লোডশেডিং বিবেচনায় অবশ্যই বলা যায় ‘আগের চেয়ে ভালো’। দাম, অনিয়ম- দুর্নীতি বিবেচনায় বলতে হবে ‘আগের চেয়ে বেশি অনেক বেশি, আগের চেয়ে ভালো নয়।’

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে ভালো যোগ্য মানুষ আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তারা ভালো কাজ আগেও করতেন, এখনও করেন। অন্যায়- অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আগেও ছিল, এখনও আছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটাতেন, এখনও ঘটান।
আগে কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নামে অপহরণ- গুমের ঘটনা এত ঘটেনি, এখন যত ঘটে। আগে শেখ হাসিনার জনসভায় পুলিশ গুলি করে ২৫/৩০ জন মানুষকে হত্যা করেছে। পেট্রোল বোমার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছে। সন্ত্রাসও আগের চেয়ে বেশি হয়েছে, মানুষ হত্যাও বেশি হয়েছে। তবে র‌্যাব কয়েকজন সদস্য কর্তৃক সাত জনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। পুলিশ মানুষের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে, এমন প্রমাণ আগে কখনও পাওয়া যায়নি। অপহরণকারী মাইক্রোবাসের পেছনে পুলিশের গাড়ি আগে কখনও দেখা যায়নি। গ্রেফতার করার কয়েক মাস পর ‘আজ গ্রেফতার’ দেখানোর অভিযোগ অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বহুগুণ বেশি। জঙ্গি পালনের অভিযোগ আগে ছিল, হলি আর্টিজানের আগে পর্যন্ত জঙ্গি জিইয়ে রাখা, আইএস- আল কায়েদা আছে প্রমাণ করার চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কোনও বিবেচনায় বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’?

৫. লক্ষ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ আগে কখনও হয়নি। আর্থিক খাতে ‘পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি’’র ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এতটা রুগ্‌ণ অবস্থা আগে কখনও হয়নি। আগে কখনও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়নি। সুইজ ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা আগে কখনও দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়নি। ড. আতিউর রহমানের মতো এতটা এমন গভর্নর আগে কখনও দেখা যায়নি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার কোনও সুযোগ তো দেখি না!
৬. বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। দেশীয় অর্থে বাজেট, নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নিয়ে কথার শেষ নেই। এখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ যে ৪০ হাজার টাকা, সে কথা বলতে শোনা যায় না। ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৬ হাজার টাকা, সে কথাও ‘উন্নয়ন’র গল্প বলাওয়ালারা বলেন না।
ঋণের পরিমাণ ‘আগের চেয়ে বেশি’ আর ‘আগের চেয়ে ভালো’ নিশ্চয় এক অর্থ বহন করে না!
৭. এরশাদ আগে কখনও ক্ষমতা দখল করার পক্ষে এভাবে কথা বলতে পারেনি। ‘ আমি ক্ষমতা নিতে চাইনি, বাধ্য হয়ে নিয়েছি’ এত বড় অসত্য সংসদে দাঁড়িয়ে বলেনি। রাজনীতিবিদদের জন্যে অত্যন্ত অসম্মানজনক অসত্য বলার পরও সংসদে কেউ প্রতিবাদ করেননি। পতিত স্বৈরাচারের এমন আস্ফালন আগে কখনও দেখা যায়নি।
এটাকে কী ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলবেন?
৮. বিনা ভোটের ‘হ্যাঁ – না’ নির্বাচনসহ এদেশের মানুষ ভোটারবিহীন নির্বাচন অনেক দেখেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন, যে নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত, এমন নির্বাচন আগে কখনও দেখেননি।
সংবিধান রক্ষার নামে ভোটার বিহীন নির্বাচনের কথা আগেও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বলা হয়েছে, এখনও বলা হচ্ছে।
কোনও বিবেচনাতেই এই নির্বাচনকে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার সুযোগ নেই।
৯. সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়মিত ফাঁস আগে কখনও হয়নি। নির্দেশ দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আগে কখনও ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ৯০% -৯৫% শিক্ষার্থীর পাস নম্বর না পাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি। পাঠ্য পুস্তক এমন সাম্প্রদায়িকরণ কোনও সামরিক সরকারও করেনি। বিএনপির জামায়াত, আওয়ামী লীগের হেফাজত পৃষ্টপোষকতা- কোনটাকে ভালো বা কম খারাপ বলবেন?
শিক্ষা ব্যবস্থার এমন করুণ পরিণতিকে নিশ্চয় ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না!
১০. কৃষক খাদ্য উৎপাদন বিরতিহীনভাবে বৃদ্ধি করছে। এখানে সরকারের খুব বেশি কোনও কৃতিত্ব নেই। কৃষককে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার দায়ে অভিযুক্ত সবগুলো সরকার। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সরকারের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ থাকে। সাম্প্রতিক হাওর এবং পাহাড়ের দুর্যোগে নজীরবিহীন অযোগ্যতা, দায়- দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। অন্য সরকারকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের অতীতের সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে, বর্তমান অন্ধকার।
২০-২৫ লাখ মেট্রিক টন চাল যে বছর আমদানি করা হয়, সে বছরই ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রফতানি করা হয়। চাল উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, রফতানিকারকও কৃতিত্ব নেওয়ার এই চালাকিকে আর যাই হোক ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না।
১১. তাহলে ‘আগের চেয়ে ভালো’ কী? ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের হিসেব ‘আগের চেয়ে ভালো’। মূল্যবৃদ্ধির অসহনীয় প্রভাবে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্ক জনজীবনে কোনও সুফল বয়ে আনতে পারছে না। সন্দেহ তৈরি হচ্ছে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের মারপ্যাঁচ নিয়ে। উৎপাদন বৃদ্ধির কৃতিত্ব কৃষকের, রিজার্ভ বৃদ্ধির কৃতিত্ব নিজ উদ্যোগে বিদেশে যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের। তারাও কৃষক, কৃষকেরই সন্তান। কৃষি উপকরণ সরবারাহে সরকারের কিছুটা কৃতিত্ব থাকলেও, প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনও কৃতিত্ব নেই, উল্টো দায় আছে অনেক।
আগের মত সরকার বিরোধী আন্দোলন নেই। শত অন্যায়ের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয় না। রামপালবিরোধী আন্দোলনসহ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার যেকোনও আন্দোলন দমন করা হয় আগের চেয়ে অনেক গুণ কঠোরভাবে। বুদ্ধিজীবীরা বিবেক বিক্রি করে আকসকামিতা- তোষামোদীতে আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ফলে হাজারও জনবিরোধী নীতি নিয়েও সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সমস্যা হচ্ছে না।
‘আগের চেয়ে ভালো’- তেমন কিছুর সন্ধান পাওয়া না গেলেও, ক্ষমতায় টিকে থাকা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

ক’জন দেখেন ঈদের নাটক?

সারওয়ার-উল-ইসলাম : এবার ঈদের আগের দিন অর্থাৎ ২৫ জুন রাত সাড়ে ন’টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন হ‌ুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘একদিন হঠাৎ’ পুনঃপ্রচার করে। নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় যে, কতবার প্রচারিত হয়েছে বিটিভি কর্তৃপক্ষের হিসেবে আছে কিনা সন্দেহ। এ রকম হাসির নাটকের সংখ্যা কমই আছে। নেই সংলাপে ‘ছ্যাবলামি’ আর অতিকথন। সাবলিলভাবেও যে হাসির ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘একদিন হঠাৎ’ নাটকটি।

আমার দুই মেয়ে বাংলাদেশের নাটক খুব একটা দেখে না। এর জন্য বকাঝকাও কম করি না। ঈদের হাসির নাটক দেখে হাসতে পারে না ওরা, জোর করে হাসানোর জন্য পরিচালকসহ অন্যদের নানা রকম কটু কথাও বলে। এবার ‘একদিন হঠাৎ’ নাটক প্রচারের সঙ্গে-সঙ্গে দু’জনকে ডেকে পাশে বসালাম। প্রথমটায় খুব বিরক্ত দু’জন, কেন বসালাম। তারপরে আবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক! পরে নাটকের ভেতরের কিছু ঘটনা আগেই বলে দেওয়ায় অনিচ্ছা থাকার পরও বসে পড়লো। আস্তে আস্তে দেখলাম ওরা বেশ মজা পেয়ে যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হাসির ঝিলিক দেখে বাবা হিসেবে এই প্রথম ব্যর্থ হইনি ভাব করে ভারিক্কি চালে বললাম, সামনে দেখবি হুমায়ুন ফরিদী আরও কী কী করে।
পরের ঘটনা হচ্ছে, নাটক শেষ না করে কন্যাদ্বয় টেলিভিশনের সামনে থেকে ওঠেনি।
এ গল্পটি শোনানোর কারণ এ জন্য যে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঈদে কোনও চ্যানেলের নাটক দেখে খুব একটা আনন্দ পাওয়ার কথা শুনি না। হয় সংলাপে ছ্যাবলামি, দৃশ্যায়নে সমস্যা, অতিঅভিনয়ে জর্জরিত আর কাহিনিতে ধারাবাহিকতার অভাব। কোনও রকমে গোঁজামিল দিয়ে শেষ করা।

বিষয় হচ্ছে, কেন বর্তমানে আমাদের ঈদের নাটক টানতে পারছে না দর্শকদের? শুধু ঈদের নাটকই বা কেন বলি, সাধারণ সময়েও নাটক টানতে পারছে না। তাই টিভি রিমোট ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের চ্যানেলে।
এ প্রসঙ্গে অনেক রকম কথা শোনা যায়। আমাদের নাটক এখন আর পরিচালকদের হাতে নেই। সেটা চলে গেছে এজেন্সির হাতে। নাট্যকার বা লেখকেরাও অসহায়। তারা যে কাহিনি বা চিত্রনাট্য করে দিচ্ছেন, তা আমূল পাল্টে ফেলছে এজেন্সির লোকজন। এই যদি হয় নাটক তৈরির অবস্থা তা হলে তো কিছুই বলার নেই।

একসময় বিষয়টা ছিল এরকম, নাট্যকার নাটক লিখবেন। নাট্যকার দেখাবেন পরিচালককে। পরিচালকের গল্প পছন্দ হলে সেটা বানানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। পরিচালক বানানোর পর চ্যানেলে জমা দেবেন। চ্যানেলের প্রিভিউ কমিটি সেটা দেখার পর নির্বাচন করবে। ভালো হলে প্রচারিত হবে। কখনও সামান্য কারেকশনের প্রয়োজন হলে পরিচালককে বলে কারেকশন করে নাটকটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন বেশির ভাগ চ্যানেলেই নাকি নেই। তবে দুই/একটি চ্যানেল এখনও সেই মহৎ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি ধরে রেখেছে। তাদের সাধুবাদ দিতেই হয়। তাদের জন্যই এখনও এই আকালের সময় দুই/একটি ভালো টেলিফিল্ম বা নাটক কিছু রুচিশীল দর্শককে ধরে রাখতে পেরেছে।

তবে এক্ষেত্রেও একটি সীমাবদ্ধতার কথা শোনা যায়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটকের বা টেলিফিল্মের বাজেটটি নির্ধারণ করে দেন। এক ঘণ্টার নাটকের জন্য বলা হয় এক লাখ ষাট থেকে আশি হাজারের মধ্যে বানাতে হবে। তা হলে কী দাঁড়ালো? গল্পের ডিমান্ড অনুযায়ী কি নাটক বাবানো সম্ভব? চরিত্র কমাতে হবে। লোকেশন পরিবর্তন করতে হবে। আউটডোরে একেবারে না যেতে পারলেই পরিচালক বেঁচে যাবে। এর মানে হচ্ছে পরিচালককে হাত পা ধরে নদীতে ফেলা আর কী। তারপর সাঁতরে তীরে ওঠে আসতে হবে। যদি জীবনে টিকে থাকতে চাও।

এখন যে পদ্ধতিতে নাটক কেনাবেচা হয় সেটা আলুপটল কেনাবেচার চেয়েও খারাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নাকি কিছু করার নেই। হতাশ হতে হয় কথাটা শুনলে।
এখন ঈদের নাটক কেনাবেচা হয় এজেন্সির মাধ্যমে। একেকটা এজেন্সি মানে নাটকের আড়ত। তারা চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে চ্যানেলের সময় কিনে নেয়। সেই সময়টায় ইচ্ছে করলেই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের পছন্দের নাটক চালাতে পারবে না। কারণ তারা অগ্রিম স্টেশনের সময় বিক্রি করে দিয়েছে। বিনিময়ে তারা তাদের সময়ের মূল্য পেয়ে যাবে। কখনও অগ্রিমও পেয়ে যায়।
যেমন ধরা যাক, রজনীগন্ধা নামে একটি এজেন্সি এবার ঈদে দশটি চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলে ঈদের সাতদিনের নাটক চালানোর সময় কিনে নিয়েছে। দামদস্তুর করে টাকার হিসেবটাও চ্যানেলের সঙ্গে ঠিক করে ফেলেছে। এখন তারা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে। কখনও নাট্যকাররা সেই এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে তাদের গল্প জমা দেয়। গল্প ভালো লাগলে টাকা দিয়ে কিনে নেয় এজেন্সি। না ভালো লাগলে অর্থাৎ তারা যেই মানের নাটক চায়, হাস্যরস সুড়সুড়ি, কাতুকুতু মার্কা গল্প হলে ভালো, না হলে নাট্যকারকে বলে সেই ধরনের গল্প নতুন করে লিখিয়ে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক বানানো শুরু করেন। এভাবে একেকটা এজেন্সি দুই থেকে তিন শ নাটক বানানোর কাজে নেমে পড়ে প্রতি ঈদে। এবার বিজ্ঞাপন পাওয়ার বিষয়। বিজ্ঞাপনদাতাদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ থাকে এসব এজেন্সির। দেখা যায় চ্যানেলের এক খণ্ড নাটক প্রচারের সময়ের দাম ঈদের কারণে চার লাখ টাকা। এজেন্সি সেই নাটকের ফাঁকে ফাঁকে যে বিজ্ঞাপন ঢোকায় তার মূল্য সাত থেকে আট লাখ টাকা। এক নাটকেই থাকছে তিন থেকে চার লাখ টাকা। এর মধ্যে এক নাটকে নাট্যকার-পরিচালক-শিল্পীসহ প্রোডাকশন খরচ বাবদ দেড় থেকে দুই/লাখ টাকা বাদ। তারপর লাভ থাকছে এক নাটকে কম করে হলেও এক লাখ টাকা।

দর্শক দেখুক আর না দেখুক নাটকগুলো ঈদে বিভিন্ন চ্যানেল প্রচার করছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে চ্যানেলগুলোর ধর্ণা দিতে হচ্ছে না। তারা তাদের টাকা পেয়ে যাচ্ছে। আর এজেন্সি কামাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
একটা সময় ছিল চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরিচালকের কাছ থেকে নাটক কিনত। তারপর এজেন্সির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতো। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা কমিশনের মাধ্যমে চ্যানেলকে বিজ্ঞাপন দিত তখন। নাটকটি পরিচালকের কাছ থেকে কিনত দুই লাখ টাকা দিয়ে। আর নাটকের ফাঁকে ফাঁকে চ্যানেল বিজ্ঞাপন ঢোকাতো নাটকের মূল্যের তিন থেকে চার গুণ। এভাবে তারা ভালো মানের নাটক পেত। লাভটাও হতো বেশি। আর এখন টাকা চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে। নাটকের মান বলে কিছু থাকছে না।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে কেন এজেন্সির প্রয়োজন? আর এইসব এজেন্সির লোকজনই বা কারা? তারা কি নাটক বোঝে? নাকি ইয়াং জেনারেশনকে শেষ করার জন্য আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য শিল্প-সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার জন্য ইয়ো ইয়ো কালচার তৈরিতে ব্যস্ত তারা। ইয়ার্কি আর ফাজলামি মার্কা সংলাপ দিয়ে নাটক তৈরি করাই কি তাদের লক্ষ্য? নাটক কেন ভালো লাগে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে? তাদের জীবনের কথা, পারিবরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নাটকগুলো কেন আমাদের মা বাবা বোন ভাবি খালা চাচিদের আজো আলোড়িত করে, সেগুলো কি ওইসব এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগীরা বোঝেন?
আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের বেশির ভাগ চ্যানেলের কর্তা ব্যক্তিরা চান না দর্শকদের মন বুঝে নাটক নির্মিত হোক। যে নাটক দেখেই চুপ করে বসে পড়বে দর্শক। সংলাপ বা কাহিনির মোচড় তাদের নাটক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শককে বসিয়ে রাখবে টেলিভিশনের সামনে। তারা চান তাদের সময়ের দাম। দর্শকের মনের দামকে তারা থোরাই কেয়ার করেন।
দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেশে এসেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজ উদ্দিন আহমদ। ক’দিন আগে একটি বেসরকারি চ্যনেলের বিশেষ সম্পাদকীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান নাটক নিয়ে বলেছেন, ইয়ার্কি আর ফাজলামি হচ্ছে।
খুবই চিন্তার বিষয়, এই জন্য যে তার মতো স্বনামধন্য একজন মানুষ যখন এরকম অনুভব করেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না, কী হচ্ছে আমাদের চ্যানেলগুলোতে নাটকের নামে।

আমরা দোষ দেই আমাদের নতুন প্রজন্মকে। তারা দেশি চ্যানেল দেখে না। দেশি নাটক দেখে না। কিন্তু সত্যি কী তাদের ওপর এই দোষের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায়? তাই যদি হয় তবে কেন আমার কলেজ পড়ুয়া আর ইস্কুল পড়ুয়া মেয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‘একদিন হঠাৎ’ দেখতে বসে না শেষ হওয়া পর্যন্ত বসেছিল?
তবে এবার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ‘ছবিয়াল ঈদ রি-ইউনিয়ন’ আর অমিতাভ রেজা চৌধুরী ‘আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ’ নামে নাটকের দু’টি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের সাধুবাদ।
আমাদের চ্যানেল মালিকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা এখনও পারেন একটু চেষ্টা করলে ভালো নাটক নির্মাণ করতে। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা। সপ্তাহে না হোক মাসে একটা নাটক তৈরি করা শুরু করেন। দেখবেন আস্তে আস্তে দর্শক ফিরবেই বাংলাদেশের চ্যানেলে।
লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

নিরাপদ সীমান্ত চাই

রুমীন ফারহানা : কিছুদিন আগে ওভালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০১৭-এর ফাইনালে খেললো ভারত-পাকিস্তান। খেলা তেমন ভালো বুঝি না কিন্তু খেলা নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ভালোই উপভোগ করি। সদ্য সমাপ্ত এই খেলাটি নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ভারত বনাম পাকিস্তান বলে কথা। বাংলাদেশ ছাড়া আর যে অল্প কিছু দেশের খেলা থাকলে সাধারণত মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করি, তার অন্যতম হলো ভারত। ভৌগলিক দিক থেকে বিশাল এই দেশটির প্রায় পেটের ভেতরে অবস্থান বাংলাদেশের। মোটা দাগে ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত কিছু মিলও আছে দেশ দু’টির মধ্যে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান চিরকাল এদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। জনবহুল অথচ দরিদ্র এই দেশটি যুদ্ধরত বাংলাদেশকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, শরণার্থী শিবির খোলা থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য প্রচারণাসহ নানাভাবে সাহায্য করেছে। অবশ্য ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল নিছকই পাকভারত যুদ্ধ। ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর সম্প্রতি বিষয়টি পরিষ্কারও করেছেন। তিনি বলেছেন ‘লঙ্কা জয় করে রাম যেমন তা বিভীষণকে দিয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভারত তাই করেছে।’ যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যেকোনও কথায় যারা ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানি খুঁজে পান, তাদের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনও বক্তব্য শুনিনি।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের। যা ভেবেই ভারত তখন সাহায্য করে থাকুক না কেন, সাহায্য যে করেছিল, সেটাই ঐতিহাসিক সত্য। আমরাও এজন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু তারপরও ভারতের যেকোনও পরাজয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে অভিব্যক্তি আমি লক্ষ করি, তা বিস্ময়কর। ভারতের সঙ্গে কে জিতল, সেটি বড় কথা নয়, শুধু ভারতের পরাজয়টাই এদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের জয়ের তৃপ্তি এনে দেয়। অনেকেই বলবেন, খেলা তো খেলাই। খেলায় একটি দলকে সমর্থন বা অসমর্থন দিয়ে পুরো দেশের মনোভাব বোঝার চেষ্টা ঠিক নয়। কিন্তু এই খেলাকে উপলক্ষ করে মানুষ যে ভাষায় তার মনের ভাব প্রকাশ করে, সেটাকে কেবলই একটি ক্রিকেট দলের প্রতি বিরাগ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো—সিএনএন, আইবিএন ও দ্য হিন্দু পরিচালিত একটি জরিপে উঠে এসেছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ মানুষ মনে করে পৃথিবীর আর সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশই তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের দেশে এমন কোনও জরিপ কখনও হয়েছে কিনা, জানা নেই। তবে সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দের অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের কথায়, লেখায় ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে; যেখানে মন খুলে মনের কথা প্রকাশ করে মানুষ। কিন্তু কেন এই বিরূপ মনোভাব? কাঁটাতারের বেড়া? সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ হত্যা? কাঁটাতারে ঝোলানো ফেলানীর লাশ? তিস্তার পানি? অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি? বাণিজ্য বৈষম্য? পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল? সাংস্কৃতিক আগ্রাসন? বাংলাদেশের বাজার দখল? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ? একতরফাভাবে বাংলাদেশ থেকে যা কিছু সম্ভব/অসম্ভব তা বাগিয়ে নেওয়া? নাকি এর সবই?

বিভিন্ন ধরনের অন্যায্যতা ছাপিয়ে ঘোষিত এই বন্ধু রাষ্ট্রটির নির্মমতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো কারণে কিংবা অকারণে কখনও গুলি করে, কখনও স্রেফ পিটিয়ে, অত্যাচার করে সাধারণ, নিরস্ত্র ও অনেক ক্ষেত্রেই নিরপরাধ বাংলাদেশিকে হত্যা করা। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতে গত এক দশকে প্রায় হাজার খানেক বাংলাদেশি বিএসএফের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র কিংবা অধিকারের পরিসংখ্যানও তাই বলে। বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এখন দক্ষিণ এশিয়ার বধ্যভূমি। যদিও এ সব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকে কখনোই যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কেবল পরিসংখ্যান ছাপিয়ে তাদের দায় সেরেছে।
এমনকী ঈদের মাত্র ৫/৬ দিন আগে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোসালপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সপ্তম ও নবম শ্রেণিতে পড়া দুই কিশোর মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর আগের তাদের তীব্র শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে দাবি পরিবারের। ঠিক কী অপরাধে এই দুই কিশোরের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো, সেটা নিয়ে অবশ্য কেউই তেমন উদ্বিগ্ন নয়। বিজিবির প্রধান কাজ এখন পতাকা বৈঠক শেষে লাশ নিয়ে আসা, সেটি তারা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে। মজার বিষয় হলো ভারত থেকেও কিন্তু প্রচুর মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই সঙ্গে আসে গাঁজা, ফেনসিডিল, অবৈধ অস্ত্রসহ বহুকিছু। তবে বিএসএফ বাংলাদেশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে যেমন স্যুট অন সাইট বা দেখা মাত্র ঠাণ্ডা মাথায় গুলিনীতিতে চলে তেমন কিন্তু নিজের দেশের অপরাধিদের ক্ষেত্রে কিংবা বিজিবিকে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

নেপালের এক গোবিন্দ গৌতমের লাশ ভারতের কাছে যত ভারি হয়ে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশের হাজার খানেক লাশের মিছিল তার কানাকড়িও করতে পারেনি। গোবিন্দকে শুধু শহীদই ঘোষণা করা হয়নি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। কারণ গোবিন্দ গৌতমের পাশে পুরো নেপাল দাঁড়িয়েছিল, বাংলাদেশ যা কোনও ক্ষেত্রেই করেনি। এমনকী ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ২১ বিএসএফের একটি দল দুর্গাপুরে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে প্রায় ৫০০ গজ ঢুকে পড়ে ও নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। বিএসএফ সদস্যরা গ্রামবাসীর গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে যায়। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরার অপরাধে বহু নিরীহ মানুষকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। এর কোনোটিরই কোনও বিচার না বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, না ভারত কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে।

সম্প্রতি দেখলাম, দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সিসি ক্যামেরা, ফ্লাশলাইট বসাতে গেলে বাধা দেয় বিএসএফ। এমনকী ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করা হয়। বাধা দেওয়ার কারণ হলো ভারতের দিকে তাক করে ক্যামেরা ও ফ্লাশলাইট বসানো হচ্ছে। শেষপর্যন্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যে পাচার, চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র, মাদক বন্ধে সীমান্তে এত সাবধানতা, এত মানুষের মৃত্যু সিসি ক্যামেরা বা ফ্লাশলাইট তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়ক হতো। ঘটনাটি প্রমাণ করে বাংলাদেশিদের বুকে গুলি তাক করা যতটা সহজ ও স্বাভাবিক ভারতের দিকে ক্যামেরা পর্যন্ত তাক করা ঠিক ততটাই কঠিন ও অসম্ভব।

যে কোনও অন্যায়, অন্যায্যতা, অবৈধতা আর বৈষম্যকে বিনা প্রতিবাদে ক্রমাগত মেনে নিতে থাকার একটাই অর্থ দাঁড়ায়। আর তা হলো এসব অন্যায়কে বৈধতা দান। দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের বৈধতা একটি ছোট দেশের সরকার নানা কারণেই তার বড় প্রতিবেশী দেশকে দিয়ে থাকে। বিশেষ করে বড় রাষ্ট্রটি যখন ছোট রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে, খোলাখুলিভাবে ক্ষমতাভোগের বা ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইতিহাস সাক্ষী—কোনও অন্যায়, অন্যায্যতাই শুভ পরিণাম বয়ে আনে না বিশেষত তাকে যদি বিনা প্রতিবাদে ন্যায্যতা দানের চেষ্টা করা হয়।

লেখক: সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি