=== console.log('header!'); // Easy to add and display post grid on your website with or without categoryies filter. Also work with Gutenberg shortcode block.


বুধবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হলি আর্টিজান: ঘুম কি ভাঙলো?

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

তুষার আবদুল্লাহ : চমকে ওঠার দিন ছিল আজ। চমকে উঠেছিলেন উঁচুতলার মানুষেরা। সমাজে কর্কট রোগ দেখা দিয়েছে, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, খবরটিকে খবর হিসেবেই দেখছিলেন তারা। ভেবেছিলেন কর্কট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে কেবল নিচুতলার মানুষ। নিচের সমাজ। নিজেরা নিজেদের প্রবোধ দিয়ে বলছিলেন- তারা, তাদের সন্তানরা যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে সেখানে জঙ্গিবাদ নামের কর্কট রোগের প্রবেশ ঘটেনি। অথচ নিরব ঘাতক এই রোগটি তাদের অন্দরে গিয়ে নিরাপদ বসত গড়েছিল। এই রোগের উপসর্গের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না, এমন কথা বলা যাবে না। সবাই উপসর্গ ধরতে পেরেছিলেন। তবে ধারণা করে উঠতে পারেননি উপসর্গটি মরণব্যাধিতে রূপ নেবে। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সুশীল নামের ‘সেলোফিন পেপার’ আবৃত সমাজ একটি ধারণার প্রচারক ছিল-জঙ্গি মানেই ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থী। তাদেরই ধর্ম বিষয়ে কট্টর অবস্থান। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা সেই প্রচারপত্র বিলিকারকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। তারা বিব্রত হয়েছিলেন, হয়েছিলেন ভীত। কারণ জঙ্গি হামলায় জড়িতরা সমাজের উঁচুতলার সন্তান ছিল। তারকা খচিত ইংরেজি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তারা। বিদেশে শিক্ষারতও ছিল কেউ কেউ। বিশেষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও সন্দেহ করা হচ্ছিল। জঙ্গিরা হলি আর্টিজানে ওই রাতে যারা উপস্থিত ছিলেন- দেশি, বিদেশি তাদের ২২ জনকে হত্যা করেছে। ছেড়ে দিয়েছে কাউকে কাউকে। সেনা অভিযানের আগে বা অভিযানে জঙ্গিদের মৃত্যু ঘটেছে। এই জঙ্গিরা কারা তা কি লুকানোর একটি চেষ্টা ছিল? প্রাথমিক ভাবে তাদের যে নাম গুলো বলে পরিচয় দেওয়া হচ্ছিল তাতো সমাজকে আবার বিশ্বাস করে নিতে হতো। প্রয়াস ছিল ওই নিচুতলা থেকে অঙ্কুরিত জঙ্গিরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত।
সেই প্রয়াসকে নস্যাৎ করে দেন হলি আর্টিজান সংলগ্ন বাড়ি থেকে তোলা কোরিয়ান ভদ্রলোকের ছবি। ফেসবুকে সেই ছবি তুলে দিলে প্রকাশ হয় সমাজের উঁচুতলা আক্রান্ত কর্কটে। জঙ্গিদের মধ্যে যারা মারা গেছে তাদের নিয়েতো পরিবার বিব্রত ছিলই। যাদের মৃত্যু হয়েছে জঙ্গি হামলায় তাদেরও কাউকে কাউকে নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। যে তরুণরা সরে পড়তে পেরেছিল সেই রাতে বা ভোরে, প্রকাশিত ছবিতে তাদের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, তারাও উঁচুতলার। তাদেরকে কালোদাগ মুক্ত রাখতেও চলেছে সুশীল কৌশল ও রাজনীতি। কোনও কোনও গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়েছিল এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে। শুরুতে যে বলছিলাম চমকে যাওয়ার কথা। সেই চমকই অনেক সুপ্ত পরিবারকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা দেখতে পেলো-তাদের সন্তানেরা অনেকদিন পরিবার ছাড়া। তাদের কোনও হদিস নেই। কোনও কোনও পরিবারের সন্তানরা স্ত্রী, সন্তান, স্বামীসহ নিখোঁজ ছিলেন। এই নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়াদের খোঁজ পড়ে যায় হলি আর্টিজান হামলার পর থেকে। নিখোঁজদের যে তালিকা পাওয়া যায়, এবং কোনও কোনও নিখোঁজ যে ভিডিও চিত্র পাঠিয়েছিল-তারা সকলেই অভিজাত বা কথিত শিক্ষিত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। এই সময়টায় টেলিভিশনের টকশো, পত্রিকার কলামে শ্রেণি বৈষম্য, বৈষম্যমূলক শিক্ষা, শিক্ষার নৈতিকতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিস্তার পর দিস্তা আলোচনা হয়েছে। কৌতুককর বিষয় হচ্ছে সেই আলোচনায় উঁচুতলার প্রতিনিধিরাই অংশ নিয়েছেন। এই প্রয়াসে তাদের সাফাই গাইতে যেমন দেখা গেছে, তেমনি আলোচনা গুলোকে তারা আতঙ্ক কাটিয়ে উঠবার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যে কাজটি এই একবছরেও করা হয়নি- সেটি হলো আমাদের শিক্ষার ব্যবস্থার সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া। শিক্ষা যে সামাজিক বৈষম্য তৈরির আতুঁড় ঘর। সেই আতুঁড়টি ভেঙে ফেলা। একই সঙ্গে সমাজের যে শ্রেণিটির কাছে সুনামের মতো সম্পদ আছড়ে পড়ছে তাতে বাঁধ দেওয়া। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নৈতিকতার মোড়কে আগামী দিনের নেতা হিসেবে তৈরি করা।

এই পথে আমরা না এগিয়ে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে হেফাজতি ফুঁ দিয়ে বসলাম। আমাদের সন্তানরা হলি আর্টিজান দেখার পরেও মহল্লায় মহল্লায় গ্যাং তৈরি করতে শুরু করলো। মহল্লার দখল নিতে সমবয়সী প্রতিপক্ষকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে বসলো। আমরা ডুবে থাকলাম দেশে আইএস আছে আইএস নাই খেলাতে। একবছরের আমলনামা ঘাটলে দেখা যাবে আমরা শুধু সময়ের অপচয় করেছি। নিজেরা নিরাপত্তা ক্যামেরায় সেলফি তুলে নিরাপদ বলে ঢেকুঁড় তুলে গেছি মাত্র। অথচ আমাদের ভোগের বেহজম সমাজে, রাষ্ট্রে কর্কট রোগকে আরো গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা আছি ভোগের ঘুমে। সাম্প্রতিক ‘রেইনট্রি’ বিস্ফোরণও আমাদের সেই ঘুম ভাঙাতে পারেনি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি