শুক্রবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্ব সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন পোপ

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
ডিসেম্বর ১, ২০১৭
news-image

মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়নোর জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস।

মিয়ানমার সফর করে বাংলাদেশে এসে বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মগুরু এ আহ্বান জানান । তবে এবারও তার বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি এড়িয়ে যান পোপ। মিয়ানমার সফরেও রোহিঙ্গা নামটি উচ্চারণ না করায় তার সমালোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে।

বিকাল ৩টায় ঢাকায় পৌঁছে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের পর বঙ্গভবনে যান পোপ। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর দরবার হলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে তিনি বক্তব্য দেন। স্পেনিশ ভাষায় তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় তা পাশে থাকা পর্দায় ইংরেজিতে দেখানো হচ্ছিল।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের দিকে ইঙ্গিত করে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, গত কয়েক মাসে রাখাইন থেকে আসা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ উদার মন এবং অসাধারণ সংহতির পরিচয় দিয়েছে। এটা ছোট কোনো বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি, মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা আমাদের ভাই-বোন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা কেউই ব্যর্থ হইনি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মিয়ানমারে নিপীড়িত মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর সহিংসতার বিরুদ্ধে পোপের অবস্থানকে ‘প্রশংসনীয়’ উল্লেখ করে বলেন, ক্যাথলিক ধর্মগুরুর এই অবস্থান সঙ্কট সমাধানে আশা দেখাচ্ছে। তিনি পোপ ফ্রান্সিসের উদ্দেশে বলেন, ‌’রোহিঙ্গাদের প্রতি মমত্ববোধ, তাদের সাহায্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনার ঐকান্তিক আহ্বান এ বিষয়ে দ্রুত ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে নৈতিক বাধ্যতা দেয়।’

তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পোপ ফ্রান্সিসের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের কর্মসূচি না থাকলেও ঢাকায় রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তার আলোচনার কথা রয়েছে বলে বাংলাদেশের খ্রিস্টান নেতারা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি পোপের সামনে সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের সরকার প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদেরকে নিজেদের আবাসভূমি মিয়ানমারের রাখাইন থেকে জোরপূর্ব বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘নারী-শিশুসহ হাজারো মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিজেদের বাড়ি ভষ্মীভূত হতে তারা নিজ চোখে দেখেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নৃশংসতার কারণে তাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আমাদের জনগণ তাদের খোলামনে স্বাগত জানিয়েছে। খাদ্য-আশ্রয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে।’

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরে পোপের উদ্দেশে আবদুল হামিদ বলেন, ‘অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষ্যিত দেশের মতো আমরাও পাশ্চাত্য সমাজে ইসলামফোবিয়ার উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের উগ্রবাদী প্রবণতা রোধে সমাজের সব স্তরে আন্তঃধর্মীয় আলোচনা জরুরি।’

অন্যদিকে পোপ ফ্রান্সিসও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে যদিও আমার সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়া, তারপরও আগামীকাল রমনায় বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আমরা সবাই একসাথে শান্তির জন্য প্রার্থনা করব এবং শান্তির জন্য কাজ করতে আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করব।’

ভাষণের শুরুতেই সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানান পোপ ফ্রান্সিস। দুই পূর্বসূরি পোপ ষষ্ঠ পল, পোপ দ্বিতীয় জন পলের বাংলাদেশ সফরের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

বাংলাদেশে আসার পথে এই দেশকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে তার কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করেন তিনি। এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় নদী আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কেও জেনেছেন তিনি।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রীদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আনিসুল হক, হাসানুল হক ইনু, এ এইচ মাহমুদ আলী, আসাদুজ্জামান নূর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, মসিউর রহমান ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়াও ছিলেন অনুষ্ঠানে। এছাড়া বাংলাদেশের কার্ডিনাল প্যাট্রিক রোজারিও, ভ্যাটিকানের দূত জর্জ কোচেরি তাদের প্রধান ধর্মগুরুর সঙ্গে ছিলেন।