বৃহস্পতিবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র উদঘাটনে কমিশন গঠনের দাবি

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
আগস্ট ১৫, ২০১৭
news-image

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যায় জড়িতদের বিচার হলেও সেটা পূর্ণাঙ্গ হয়নি বলে জোরাল মত আছে। কারণ, এই হত্যার ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সেটি তদন্তে উঠে আসেনি। এই পরিস্থিতিতে এই ষড়যন্ত্র উদঘাটনে কমিশন গঠনের দাবি উঠে এসেছে শোক দিবসের আলোচনায়।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে শোক দিবসের আলোচনায় এই দাবি উঠে আসে। এর আগে অন্য একটি আয়োজনে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও একই কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবসের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘তাঁকে (বঙ্গবন্ধু) হত্যার পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। এই ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত তথ্য আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সন্নিবেশিত হওয়া প্রয়োজন। এই হত্যা রহস্যের উদ্ঘাটন এখন সময়ের দাবি।’

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রের মূল ধারাই পাল্টে ফেলা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ পাল্টে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আদর্শ চালু হয়। স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতি শুরুর সুযোগ পায়। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও চলে আসে তারা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৬ বছর দেশ ছিল সামরিক শাসনের অধীনে।

এই সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করা যাবে না মর্মে জারি হয় অধ্যাদেশ। আবার খুনিদের পুরষ্কৃত করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চাকরি দেয়া হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ বন্ধ রাখা হয় কেবল এই মামলার শুনানি বন্ধ রাখতে। পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিচারক নিয়োগের পর শুরু হয় বিচার। আর ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে আপিল বিভাগ ফাঁসি দিয়েছিল মোট ১২ জনকে। বাকি আসামিদের মধ্যে এক জন মারা গেছেন বিদেশে, আর ছয় জনকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

যারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল, কেবল তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু এর নেপথ্যে কারা ছিল, সেটা বের করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছর ধরেই এই ষড়যন্ত্র উদঘাটনের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন ইতিহাসবেত্তারা।

শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার সঙ্গে অনেক রাঘব-বোয়াল জড়িত ছিল। কিন্তু তদন্তে দুর্বলতার জন্য তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করা যায়নি। এটি ছিল একটি ফৌজদারি ষড়যন্ত্র।’

উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানির স্মৃতিচারণ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি নথি পর্যালোচনা করে দেখলাম এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে আরো অনেক রাঘব বোয়াল অনেকে… জড়িত ছিল। কিন্তু ইনভেস্টিগেশনের ত্রুটির জন্য আমরা তাদের আর বিচারে সোপর্দ করতে পারি নাই।’

‘আমাদের রায়ে আমরা পরিস্কারভাবে বলে দিয়েছি এটা একটা ক্রিমিনাল কনস্পিরেসি, পরিকল্পিতভাব হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে বিচারের সোপর্দ করার জন্য।’

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে টিএসসির আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। সৎ, উদার, দেশপ্রেমিক, সাহসী ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মহান নেতা ছিলেন তিনি। মানুষকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সাধারণ মানুষের ভাগোন্নয়নের সংগ্রামে তিনি মৃত্যু, জেল, জুলুমকে কখনও ভয় পাননি। আমাদের গর্ব, এ ধরণের নেতা আমরা পেয়েছিলাম।’

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ছাত্রত্ব হারান। পরে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২৪ বছর সংগ্রাম করে আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দেন।’

‘আজীবন তিনি আভিজাত্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেটের সামনেও তিনি অবিচল ছিলেন। এই আভিজাত্য নিয়েই তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।’

উপাচার্য বলেন, ‘১৫ আগস্টকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ কামাল উদ্দীন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ এস এম মাকসুদ কামাল, সাধারণ সম্পাদক রহমত উল্লাহ, অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ আলী আকবর, সাবেক উপ-রেজিস্ট্রার এ কে এম আমির হোসেন মিয়া প্রমুখ এ সময় বক্তব্য রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এনামউজ্জামান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

এবার বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচীর মধ্যে ছিল- সব ভবন ও হলে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।