মঙ্গলবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় মসলা সিন্ডিকেট

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২১, ২০১৭
news-image

 পবিত্র ঈদুল ফিতর শেষ হলো মাত্র কয়েকদিন। ঈদুল আজহা অর্থাৎ কোরবানির ঈদ আসতে দেড় মাসেরও বেশি সময় বাকী। কিন্তু এরই মধ্যে কোরবানির ঈদের অন্যতম প্রয়োজনীয় পণ্য মসলা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে তেলেসমাতি কারবার।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের তরফ থেকে অভিযোগ উঠেছে, কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে এখন থেকেই সক্রিয় হচ্ছে মসলার সিন্ডিকেট। তারা সরকারের বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকেই তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মসলা সিন্ডিকেট এবার টার্গেট করেছে রসুন ও আদাকে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদে প্রায় সব মসলার দামই বাড়তি থাকে। বলতে গেলে এটা একরকম নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মসলার বাজারে এবার উত্তাপ ছড়াবে রসুন ও আদা- এ আশঙ্কা করা হচ্ছে। মসলা আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের আলোচনাতেও এ আশঙ্কার কথা প্রকাশ পেয়েছে। যদিও তারা বলছেন, এই দুটি পণ্যের সাথে যোগ হবে সয়াবিন তেল, শুকনো মরিচ ও হলুদ। অবশ্য, এরই মধ্যে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কোরবানীর ঈদের আগে এসব পণ্যের দাম আর কমবে না।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মসলা ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য থাকে সারা বছরের লাভ কোরবানীর ঈদ মৌসুমেই তুলে নেওয়া। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে গরম মসলার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও শুকনা মরিচের চাহিদাও বাড়ে। চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আমদানিও বাড়ান। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোগানও বাড়ে। কিন্তু বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে ইচ্ছেমতো এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এবারো তেমনটিই ঘটতে যাচ্ছে। রোজার ঈদের সময় মসলার দাম সেই যে বেড়েছে, তা এখন পর্যন্ত কমেনি। দিনে দিনে দাম কেবল বাড়ছেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মসলা ও বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও বাড়তে শুরু করবে বলে তারা ধারণা করছেন।

বাংলাদেশ গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির নেতা হাজি এনায়েতুল্লাহ প বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি আরো আগেই শুরু হয়ে গেছে। কারণ, মসলার বাজার অনেকটাই আমদানি নির্ভর। সেক্ষেত্রে এলসি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আগে থেকেই শুরু করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘কোরবানির ঈদে মসলার চাহিদা বাড়ার কারণে আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে হয়। এ কারণে অনেক সময় বাড়তি দামেও এসব পণ্য আমদানি করতে হয়। এবারো চাহিদার দিকে লক্ষ রেখে আমদানি হচ্ছে। ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই।’

দাম বৃদ্ধির বিষয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘ভারতের বাজারে মসলার দাম গত বছরের মতো এবারো বাড়তি। এই প্রভাব দেশের বাজারে পড়তে পারে। তবে সবকিছু বলা যাবে আগস্টের শেষ দিকে।’

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমান্তে গরু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মসলার চোরাচালানীরাও সক্রিয় আছে। এ বিষয়ে বিজিবিকে যথেষ্ট সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সীমান্তের পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের দুয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

রাজধানীর দুয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এরই মধ্যে কিছু পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি আদার দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। রসুনেরও একই অবস্থা। প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি লবঙ্গ ১৫০, জিরা ৪০, এলাচ ১২০ ও ধনে ১০ টাকা করে বেড়েছে।

পাইকারি বাজারে বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা গেছে, চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৭ টাকা দরে। অথচ খুচরা পর্যায়ে ২০০ টাকার কমে রসুন পাওয়া যাচ্ছে না। ভোক্তাদের অভিযোগ অস্বাভাবিক লাভ করছেন দোকানিরা। একই অবস্থা চীনা আদার ক্ষেত্রেও। পাইকারিতে যে আদা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, সেটি খুচরায় ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে বার্মিজ আদা ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বাজারে বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি লবঙ্গ ১৩০০, জিরা ৪৫০, এলাচ ১৯০০, দারুচিনি ৩০০, কিসমিস ৩৫০ ও ধনে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশী পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৪৮, আমদানি করা পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫, দেশী রসুন ১৬০ থেকে ১৭০, আমদানি করা চীনা রসুন ১৯০ থেকে ২০০ ও আদা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে। মোকাম থেকে বেশি দামে কিনতে হয় বলে দাম বেড়েছে এমনটি জানান বিক্রেতারা।

ভারত থেকে দুই ধরনের শুকনা মরিচ আমদানি হয়। একটির ঝাল বেশি, অন্যটির তুলনামূলক কম। বৃহস্পতিবার বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় শুকনা মরিচ (ঝাল বেশি) বিক্রি হয় ১২৫-১২৮ টাকায়। ঈদের পর পরই বাজারে একই মানের মরিচ ১০০-১০৫ টাকায় বিক্রি হয়। সেই হিসাবে তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ২০ টাকা। ঈদের পর বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় শুকনা মরিচ (ঝাল কম) বিক্রি হয় ৭৮-৮০ টাকা দামে। কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে এ জাতের মরিচ ১০৫-১০৭ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদে মসলার যে পরিমাণ চাহিদা থাকে, তা সারা বছরের চাহিদার চেয়ে বেশি। সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মসলা ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এ সময় বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। এবারো বাজারের চাহিদাকে পুঁজি করে তারা তৎপর। দফায় দফায় বাড়ছে মসলার দাম। অথচ আমদানিকারকেরা মসলার চাহিদার দিকে দৃষ্টি রেখে যথেষ্ট পরিমাণ আমদানি করেছেন যেন ঘাটতি না পড়ে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের বাজারে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নেই, ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাও নেই। ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হচ্ছে। আশঙ্কা রয়েছে এবারো।

যদিও আশার বাণী শুনিয়েছেন বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু। ‘কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে মসলা ও অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশে কোনো পণ্য মজুত করে রাখতে না পারে সেজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার মনিটরিং আরো জোরদার করবে। যে কেউ এ ধরনের অপতৎপরতার সাথে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।