মঙ্গলবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

নওগাঁয় ৬৯ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য, নাজুক স্বাস্থ্য সেবা

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

নওগাঁর ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ২৭৫টি পদের ১৯০টিই শূন্য। এ কারণে জেলায় চিকিৎসা সেবার নাজুক হয়ে পড়েছে। চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র সাধারণ মানুষ। নওগাঁ সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ২৭৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৫জন অর্থাৎ জেলায় ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।

সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৩টি পদের মধ্যে সবাই কর্মরত আছেন, মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ২১ পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ৫জন, মহাদেবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১জনের জায়গায় আছেন ৯জন, আত্রাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০জনের স্থলে আছেন ৮জন, রানীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০জনের মধ্যে ৮জন, বদলগাছি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ পদের মধ্যে ১১জন, পত্নীতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১জনের মধ্যে ৯জন, সাপাহার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১জনের মধ্যে ৭জন, নিয়ামতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩জনের জায়গায় ৮জন, পোরশা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০জনের মধ্যে ৬জন এবং ধামইরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ পদের মধ্যে ৭জন চিকিৎসক আছেন। আর জেলার ৯৯টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনোটিতেই বর্তমানে চিকিৎসক নেই। সিভিল সার্জন অফিসে কর্মরত ৪জন চিকিৎসকসহ জেলায় ২৭৫টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে মাত্র ৮৫জন কর্মরত আছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর কোনো কোনোটিতে আবার শল্যচিকিৎসকের অভাবে বড় অস্ত্রোপচার হয় না।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। রোগীদের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। কথা হয় উপজেলার ছোট বেলালদহ গ্রামের সানোয়ারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিন দিন আগে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা না পয়ে ঘুরে গেছি। তাই আজ আবার আসছি। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ডাক্তার নাই। দেড় ঘণ্টা ধরে শুনছি ডাক্তার আসছে। আজকে চিকিৎসা না পাইলে চিন্তা করছি আর এখানে আসুম না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মনোরঞ্জন মন্ডল বলেন, প্রতিদিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫০ থেকে ৩০০জন রোগী সেবা নিতে আসেন অথচ ৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র ৫জন। মান্দার মতো চিকিৎসক-সংকট রয়েছে মহাদেবপুর, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ৫০ শয্যার এসব হাসপাতালে মাত্র ছয়-সাতজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম।

পত্নীতলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার চৌধুরী বলেন, উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক না থাকায় রোগীর সব চাপ এসে পড়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। মাত্র আটজন চিকিৎসক দিয়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০জন রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে নয়, চিকিৎসক-সংকট আছে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট সদর আধুনিক হাসপাতালেও। এ হাসপাতালে ৪২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩২জন চিকিৎসক। অথচ প্রতিদিন এ হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রায় দেড় হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন।

নওগাঁ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মুনীর আলী আকন্দ বলেন, বহির্বিভাগে সকাল নয়টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত আটজন চিকিৎসক প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি রোগী দেখেন।

সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মো. এমদাদুল হক বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অস্ত্রোপচার না হওয়ায় পুরো জেলার রোগী এখানে আসে। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রতিদিন গড়ে ১৫০জন রোগী ভর্তি থাকে। প্রায় সময়ই অনেক রোগীকে মেঝেতে থাকতে হয়।
এসব বিষয়ে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডাঃ রওশন আরা খানম বলেন, ২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএসে পাস করা প্রায় ৫০জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর নওগাঁয় আর কোনো চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দুই বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই তাদের অনেকে উচ্চতর কোর্স করতে বিদেশে বা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এতে চিকিৎসক-সংকট প্রকট হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অধিদপ্তর থেকে শূন্য পদের তালিকা চেয়ে পাঠানো হয়েছে। আমরা সেই তালিকা অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৩৪ ও ৩৫তম বিসিএসএ পাস করা চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ফল পাচ্ছি না।’