সোমবার, ২১শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সন্তানকে কারা জঙ্গি বানাল? : ইন্ধনদাতাদের শাস্তি না দেওয়াটা জঘন্যতম অপরাধ

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ১, ২০১৭
news-image

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিহত দুই জঙ্গি শফিকুল ইসলাম ও খায়রুল ইসলাম। তাঁদের মা-বাবা এখনো জানেন না, সন্তানকে কারা জঙ্গি হতে মদদ জুগিয়েছিল। সন্তানের কৃতকর্মের জন্য তাঁরা লজ্জিত। কিন্তু আড়াল থেকে কলকাঠি কে নেড়েছিল, সে প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায় মনে। উত্তর মেলে না।

শফিকুল ইসলামের বাবা বদিউজ্জামানের বাড়ি বগুড়ায়। নিজেকে ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দাবি করে বদিউজ্জামান বলেন, ‘ছেলে ঢাকার আশুলিয়ায় বেসরকারি একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা ও টিউশনি করত। গুলশানে রেস্তোরাঁয় জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত এমনটাই জানতাম। কিন্তু কারা তাকে জঙ্গি হামলায় মদদ জুগিয়েছিল, কাদের ইন্ধনে ভয়ংকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল, সেটা এখনো অজানা।’

বদিউজ্জামান আরও বলেন, ‘ছেলের হয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইছি। গত বছরের ওই জঙ্গি হামলার ঘটনায় দেশবাসীর কাছে আমি লজ্জিত ও অনুতপ্ত। বিশেষ করে গুলশান হামলায় নিহত দেশি-বিদেশি নাগরিক ও তাঁদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইছি ছেলের কৃতকর্মের জন্য। ছেলের লাশ পাইনি, তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু আর কোনো ছেলের যেন এমন কলঙ্কজনক মৃত্যু না হয়। আর কোনো বাবাকে যেন ছেলের জন্য এমন লজ্জিত হতে না হয়।’
শফিকুলের চাচা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আফজাল হোসেন নিজেকে ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি দাবি করে বলেন, ‘আমরা গোটা পরিবার আওয়ামী লীগ করি। আমাদের পরিবারে জঙ্গি দূরে থাক, কেউ জামায়াত-শিবিরও করে না। শফিকুল জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হওয়ার পর থেকে মানুষকে মুখ দেখাতে পারি না। সবাই জঙ্গি পরিবার বলে উপহাস করে। অথচ কারা তাকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ইন্ধন জুগিয়েছিল, সেটা এখনো অজানা। ছেলের শোকে তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। ছেলের কর্মকাণ্ডে অনুতপ্ত ও বিব্রত তিনি। যারাই তাকে ওই অনিশ্চিত সন্ত্রাসী পথে টেনে নিয়ে যাক না কেন, পথটা ছিল অন্ধকার, অনিশ্চিত।’

 

গুলশানে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত আরেক জঙ্গি খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল (জেএমবিতে বাঁধন নামে পরিচিত)। তাঁর বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চুপিনগর ইউনিয়নের বৃ-কুষ্টিয়া গ্রামে। পড়তেন বাড়ির পাশে বিহিগ্রাম আহছানিয়া দারুল উলুম সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসায়। গুলশান হামলার বছর খানেক আগে অনার্সে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করার কথা বলে বাড়ি থেকে এক সহপাঠী ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন খায়রুলকে। কখনো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, আবার কখনো ঢাকা কলেজে ভর্তির হওয়ার চেষ্টার কথা বলেন তিনি। গুলশান হামলার ছয় মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। এ ঘটনায় খায়রুলের মা পিয়ারা বেগম ছেলের নিখোঁজের কথা জানিয়ে শাজাহানপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন।
মা পিয়ারা বেগম বলেন, তিনি নিশ্চিত, কোচিং করার কথা বলে খায়রুলকে বাড়ি থেকে ঢাকায় নিয়ে যান সহপাঠী আবদুল হাকিম। এই আবদুল হাকিমই ফুসলে তাঁর ছেলেকে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।

গুলশান হামলার পর থেকেই হাকিম পলাতক ছিলেন। পরে বগুড়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণের পর থেকে র‍্যাবের হেফাজতে রয়েছেন তিনি।

পিয়ারা বেগম বলেন, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা নির্মম, কষ্টকর, তা মা ছাড়া কেউ বুঝবে না। তিনি বলেন, ‘এখনো বিশ্বাস হয় না, আমার ছেলে গুলশান হামলার মতো জঘন্য কাজ করতে পারে! তবে যদি সত্যিই কারও ইন্ধনে এমন জঘন্য কাজ করেই থাকে, তবে মা হিসেবে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইছি।’

তবে এই মায়ের প্রশ্ন, গুলশান হামলা জঘন্যতম অপরাধ হলে অবুঝ যেসব ছেলেকে সেখানে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই ইন্ধনদাতাদের শাস্তি না দেওয়াটা জঘন্যতম অপরাধ। তিনি বলেন, ‘যারা আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে জঙ্গি বানাল, সেই নেপথ্যের নায়ক আবদুল হাকিমদের প্রতি সরকারের কোনো অনুকম্পা দেখতে চাই না। তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ উৎসঃ প্রথমআলো