সম্পাদকীয় – Sherakantha-সেরা কণ্ঠ https://sherakantha.com Just another WordPress site Sun, 16 Jul 2023 13:45:23 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=6.9.4 রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে https://sherakantha.com/2023/07/16/%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%93-%e0%a6%a6%e0%a7%82-2/ Sun, 16 Jul 2023 11:31:02 +0000 https://sherakantha.com/?p=131546 Continue reading রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে →]]> রাজধানী অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত হওয়ার যত ধরনের কর্মকান্ড রয়েছে, তার সবই নির্বিঘে চলছে। রাজধানীর এই পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই, এর কোনো কর্তৃপক্ষ রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘসূত্রতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বছরের পর বছর ধরে বর্ষায় রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত ও পানিতে যেমন তলিয়ে যায়, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে তা ধুলো ধূসরিত হয়ে পড়ে। রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিক ও স্বস্তিকরভাবে চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। রাজধানীর বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এতটাই সীমাছাড়া হয়েছে যে, মানুষ নানা রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক নানা সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, অ্যাজমা, অ্যালার্জিসহ নানা ধরনের জটিল রোগ নগরবাসীর শরীরে বাসা বাঁধছে। গত সপ্তাহে ভারতের রাজধানী দিল্লী বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় সেখানের স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দূষিত ও ঘোলাটে ধোঁয়া শহরটিকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সূর্য পর্যন্ত দেখা যায়নি। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় যেভাবে দূষণ কর্মকান্ড চলছে, তাতে দিল্লীর মতো হতে খুব বেশি দেরি হবে না। রাজধানীর দূষিত পরিবেশের পাশাপাশি এর সৌন্দর্য বিনষ্টের আরেকটি উৎপাত হচ্ছে, যত্রতত্র বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা। ভিআইপি সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত এমন কোনো রাস্তা নেই, যেখানে সৌন্দর্য বিনষ্টকারি এসব উপকরণ চোখে পড়ে না। রাজধানীতে এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশ ও কর্মকান্ড আর কোনো দেশে ঘটে কিনা, জানা নাই।
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী হিসেবে ঢাকা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনোমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে ১৪০টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম বা তৃতীয়। দূষণের বাইরে বসবাস অযোগ্য নগরী হিসেবে ঢাকা বেশ কয়েকবার এক নম্বরে ছিল। এতে অবশ্য ঢাকার পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য যেসব কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তাদের কিছু যায় আসেনি। যেমন চলছে, তেমন চলবে-এমন একরোখা মনোভাবই প্রদর্শিত হচ্ছে। দিন দিন আরও খারাপের দিকে গেলেও তাতে কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। রাস্তার খোঁড়াখুড়ির কথা যদি ধরা হয়, তবে দেখা যাবে, এর কোনো সময়কাল নেই। শীত-বর্ষা থেকে শুরু করে সারাবছরই অবিরাম খোঁড়াখুড়ি চলছে। রাজধানীর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব খোঁড়াখুড়িকে উন্নয়ন কর্মকান্ড বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। উন্নয়ন চাইলে ভোগান্তি সইতে হবে, এ বার্তাই যেন নগরবাসীকে তারা সবসময় দিয়ে আসছে। উন্নয়ন নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়, তবে সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতো, তবে ভোগান্তি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। একটি রাস্তা একবার খোঁড়া হলে তা কবে ঠিক হবে, তার কোনো সময়সীমা থাকে না। এক প্রতিষ্ঠান খুঁড়ে কোনো রকমে মাটিচাপা দিয়ে গেলে আরেক প্রতিষ্ঠান খুঁড়তে শুরু করে। খোঁড়াখুড়িও শুরু হয় বর্ষাকালে। ফলে বৃষ্টি হলে খুঁড়িত স্থানগুলো যেমন তলিয়ে বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হয়, তেমনি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এখন অবশ্য খোঁড়াখুড়ি সারাবছরই চলে। এই উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না। যেহেতু এর শেষ নেই, তাই এ কর্মকান্ডকে অন্তত একটি পরিকল্পনার আওতায় আনা অসম্ভব কিছু নয়। এজন্য প্রয়োজন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সদিচ্ছা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে এর লেশমাত্র নেই, তা তাদের কর্মকান্ড থেকেই বোঝা যায়। পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে যদি দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা হয়, তবে নগরীকে যে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করা যায়, তা ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের নেয়া কিছু উদ্যোগ থেকে প্রমাণিত হয়েছে। তার আওতাধীন এলাকায় তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে পরিবেশ, সড়ক ও ফুটপাতের যে উন্নয়ন করেছেন, তার সুফল কিছুটা হলেও ঐ এলাকার মানুষ পাচ্ছে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এমন মনোভাব পোষণ করতো, তবে রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তোলা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত। পরিবেশ দূষণ হ্রাস থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট চলাচল উপযোগী হতো। রাজধানীর সৌন্দর্য ও পরিবেশ দূষণের আরেকটি বড় উপদ্রব হচ্ছে যত্রতত্র ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ঝুলিয়ে রাখা। এগুলোর কারণে নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে। এসব কাজে ক্ষমতাসীন দল এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যে এগিয়ে, তা রাস্তায় বের হলেই দেখা যায়। মাসের পর মাস এসব ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলে আছে। সরানোর নামগন্ধ নেই। আবার ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতা রাজপথ দখল করেই তোরণ নির্মাণ করে রেখেছে। এতে যে যানজট সৃষ্টি ও সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে, তার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ক্ষমতার অপব্যবহার কতভাবে হতে পারে, তা এসব কর্মকান্ড দেখলেই বোঝা যায়।
রাজধানীকে অবাসযোগ্য ও অপরিচ্ছন্ন রেখে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আশা করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একটি মধ্যম আয়ের দেশের রাজধানী কেমন হয়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। পানিবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশ দূষণের তীব্রতা বজায় রেখে যদি মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করা হয়, তবে তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর করতে রাজধানীকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। অসময়ে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি, পানিবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ধুলিদূষণ বন্ধ এবং যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুন টানানোর মতো অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নগরীর গতিশীল ও সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন চলছে, তেমন চলবে-এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড সমন্বয়ের মাধ্যমে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। নগরীকে সভ্য ও বাসযোগ্য করে তুলতে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে।

]]>
বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন সামাজিক অপরাধ দমনে সক্রিয় হোন https://sherakantha.com/2019/03/23/%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%aa/ Sat, 23 Mar 2019 06:41:05 +0000 http://sherakantha.com/?p=128736 Continue reading বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন সামাজিক অপরাধ দমনে সক্রিয় হোন →]]> জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা জরিপে বাংলাদেশ সামাজিক বিভিন্ন সূচকে যথেষ্ট এগিয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও সামাজিক অপরাধপ্রবণতা একটুও কমেনি বলেই মনে হয়। প্রতিদিন গণমাধ্যমে যে খবর আসছে, তাতে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বাগেরহাটের সদর উপজেলায় এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই জেলার মোরেলগঞ্জে মুক্তিপণের দাবিতে মায়ের কোল থেকে অপহরণ করা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। অপহরণের ছয় দিন পর গত রবিবার তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপহরণকারী চক্রের মূল হোতাকে পুলিশ ঢাকা থেকে আটক করেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ীই শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ছাগল চুরির ঘটনা নিয়ে এক বিধবাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে প্রথমে পেটানো এবং পরে চুল কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সমাজকে যেন কোনোভাবেই অপরাধমুক্ত করা যাচ্ছে না। সামাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি কারণে বিস্তৃত হচ্ছে সামাজিক অপরাধের মাত্রা। অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অসুস্থ ধারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনের শাসনের অভাব ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। সহনশীলতার মাত্রাও যেন হ্রাস পেতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সামাজিক অপরাধের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই, বরং এ ধরনের অপরাধের বিস্তৃতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্বেগ দূর করতে হলে এখনই দ্রæত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সমাজেরও বড় ধরনের দায় রয়েছে। প্রায় হারিয়ে যেতে বসা সামাজিক বন্ধন ও অনুশাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সমাজকে অপরাধমুক্ত করে সুন্দরভাবে নতুন করে গড়ে তোলার রাজনৈতিক অঙ্গীকার যদি না থাকে, তাহলে কোনোভাবেই সমাজের দূষণ দূর করা যাবে না। সব ধরনের সামাজিক অনাচার দূর করার জন্য যে অনুশাসন প্রয়োজন, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক শক্তিকে আগে ঐক্যে পৌঁছতে হবে। অন্যথায় সমাজ অপরাধমুক্ত হবে না। মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটে গেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য দরকার বড় ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সেটাও নির্ভর করছে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। ইতিবাচক রাজনীতি সামাজিক অবক্ষয় রোধে ভ‚মিকা রাখবে এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
বাগেরহাট ও জয়পুরহাটে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তিই কাম্য।

]]>
রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে https://sherakantha.com/2017/11/17/%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%93-%e0%a6%a6%e0%a7%82/ Fri, 17 Nov 2017 05:02:16 +0000 http://sherakantha.com/?p=126756 Continue reading রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে →]]>  রাজধানী অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত হওয়ার যত ধরনের কর্মকান্ড রয়েছে, তার সবই নির্বিঘে চলছে। রাজধানীর এই পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই, এর কোনো কর্তৃপক্ষ রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকান্ডের দীর্ঘসূত্রতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বছরের পর বছর ধরে বর্ষায় রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত ও পানিতে যেমন তলিয়ে যায়, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে তা ধুলো ধূসরিত হয়ে পড়ে। রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিক ও স্বস্তিকরভাবে চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। রাজধানীর বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এতটাই সীমাছাড়া হয়েছে যে, মানুষ নানা রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক নানা সমস্যা সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, অ্যাজমা, অ্যালার্জিসহ নানা ধরনের জটিল রোগ নগরবাসীর শরীরে বাসা বাঁধছে। গত সপ্তাহে ভারতের রাজধানী দিল্লী বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় সেখানের স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দূষিত ও ঘোলাটে ধোঁয়া শহরটিকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সূর্য পর্যন্ত দেখা যায়নি। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় যেভাবে দূষণ কর্মকান্ড চলছে, তাতে দিল্লীর মতো হতে খুব বেশি দেরি হবে না। রাজধানীর দূষিত পরিবেশের পাশাপাশি এর সৌন্দর্য বিনষ্টের আরেকটি উৎপাত হচ্ছে, যত্রতত্র বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা। ভিআইপি সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত এমন কোনো রাস্তা নেই, যেখানে সৌন্দর্য বিনষ্টকারি এসব উপকরণ চোখে পড়ে না। রাজধানীতে এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশ ও কর্মকান্ড আর কোনো দেশে ঘটে কিনা, জানা নাই।
বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী হিসেবে ঢাকা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনোমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে ১৪০টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম বা তৃতীয়। দূষণের বাইরে বসবাস অযোগ্য নগরী হিসেবে ঢাকা বেশ কয়েকবার এক নম্বরে ছিল। এতে অবশ্য ঢাকার পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য যেসব কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তাদের কিছু যায় আসেনি। যেমন চলছে, তেমন চলবে-এমন একরোখা মনোভাবই প্রদর্শিত হচ্ছে। দিন দিন আরও খারাপের দিকে গেলেও তাতে কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। রাস্তার খোঁড়াখুড়ির কথা যদি ধরা হয়, তবে দেখা যাবে, এর কোনো সময়কাল নেই। শীত-বর্ষা থেকে শুরু করে সারাবছরই অবিরাম খোঁড়াখুড়ি চলছে। রাজধানীর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব খোঁড়াখুড়িকে উন্নয়ন কর্মকান্ড বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। উন্নয়ন চাইলে ভোগান্তি সইতে হবে, এ বার্তাই যেন নগরবাসীকে তারা সবসময় দিয়ে আসছে। উন্নয়ন নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়, তবে সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতো, তবে ভোগান্তি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। একটি রাস্তা একবার খোঁড়া হলে তা কবে ঠিক হবে, তার কোনো সময়সীমা থাকে না। এক প্রতিষ্ঠান খুঁড়ে কোনো রকমে মাটিচাপা দিয়ে গেলে আরেক প্রতিষ্ঠান খুঁড়তে শুরু করে। খোঁড়াখুড়িও শুরু হয় বর্ষাকালে। ফলে বৃষ্টি হলে খুঁড়িত স্থানগুলো যেমন তলিয়ে বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হয়, তেমনি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এখন অবশ্য খোঁড়াখুড়ি সারাবছরই চলে। এই উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি কবে শেষ হবে, তা কেউ জানে না। যেহেতু এর শেষ নেই, তাই এ কর্মকান্ডকে অন্তত একটি পরিকল্পনার আওতায় আনা অসম্ভব কিছু নয়। এজন্য প্রয়োজন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সদিচ্ছা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে এর লেশমাত্র নেই, তা তাদের কর্মকান্ড থেকেই বোঝা যায়। পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে যদি দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা হয়, তবে নগরীকে যে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করা যায়, তা ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের নেয়া কিছু উদ্যোগ থেকে প্রমাণিত হয়েছে। তার আওতাধীন এলাকায় তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে পরিবেশ, সড়ক ও ফুটপাতের যে উন্নয়ন করেছেন, তার সুফল কিছুটা হলেও ঐ এলাকার মানুষ পাচ্ছে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এমন মনোভাব পোষণ করতো, তবে রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তোলা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত। পরিবেশ দূষণ হ্রাস থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট চলাচল উপযোগী হতো। রাজধানীর সৌন্দর্য ও পরিবেশ দূষণের আরেকটি বড় উপদ্রব হচ্ছে যত্রতত্র ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ঝুলিয়ে রাখা। এগুলোর কারণে নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে। এসব কাজে ক্ষমতাসীন দল এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যে এগিয়ে, তা রাস্তায় বের হলেই দেখা যায়। মাসের পর মাস এসব ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলে আছে। সরানোর নামগন্ধ নেই। আবার ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো নেতা রাজপথ দখল করেই তোরণ নির্মাণ করে রেখেছে। এতে যে যানজট সৃষ্টি ও সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে, তার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ক্ষমতার অপব্যবহার কতভাবে হতে পারে, তা এসব কর্মকান্ড দেখলেই বোঝা যায়।
রাজধানীকে অবাসযোগ্য ও অপরিচ্ছন্ন রেখে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আশা করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একটি মধ্যম আয়ের দেশের রাজধানী কেমন হয়, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। পানিবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশ দূষণের তীব্রতা বজায় রেখে যদি মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করা হয়, তবে তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর করতে রাজধানীকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। অসময়ে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি, পানিবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ধুলিদূষণ বন্ধ এবং যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুন টানানোর মতো অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নগরীর গতিশীল ও সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন চলছে, তেমন চলবে-এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড সমন্বয়ের মাধ্যমে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। নগরীকে সভ্য ও বাসযোগ্য করে তুলতে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে।

]]>
তারুণ্যের আদর্শ https://sherakantha.com/2017/08/06/%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b6/ Sun, 06 Aug 2017 17:17:50 +0000 http://sherakantha.com/?p=122898 Continue reading তারুণ্যের আদর্শ →]]> শেখ কামাল জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৪৯ সালের ৫ই আগস্ট, গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর হাত ধরে তাঁর সম-সাময়িক লক্ষ-কোটি তরুণ দেখেছিল এক আলোর সন্ধান। তাঁর হাত ধরে ঐ সময়ের তরুণরা চলতে শুরু করেছিল আলোর পথে। অনেক বড় পরিবারের ছেলে হওয়া স্বত্বেও তিনি ছিলেন নিরহংকারী। খুব সাধারণ ছিল তাঁর জীবনযাত্রা। তাঁর বাবা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তিনি ছিলেন সেই সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, বাংলাদেশের জাতির পিতার সন্তান। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধুর এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে তিনিও নিহত হন।

জাতির পিতার সন্তান হওয়া স্বত্বেও পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন সাধারণ মানুষের মতো। তাদের জীবন ধারণও ছিল খুব সহজ সরলতার মধ্যে। পারিবারিক বন্ধন ছিল অটুট, বন্ধুবৎসল। লেখাপড়ায় শেখ কামাল ছিলেন খুবই মেধাবী। ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ-বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) পাশ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি সমাজ বিজ্ঞানে এমএ শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছিলেন।

একটি সংস্কৃতি-মনা পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। বাঙ্গালির পরিচয় যে সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে নয় তা শেখ কামালের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছায়ানটের সেতার বাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মঞ্চ নাটক করতেন। সেই সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভালো সংগঠক ছিলেন। বন্ধুদের মধ্যে যারা শিল্পী ছিলেন তাদের নিয়ে “স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী” নামে একটি সংগঠনও তৈরি করেছিলেন। ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। ভাল অভিনেতা হিসেবে তাঁর সুনামও ছিল। মোট কথা পুরা-দমে একজন সংস্কৃতি-মনা ব্যক্তিত্ব ছিলেন শেখ কামাল।

শুধু কি তাই? শেখ কামাল একজন ভালো ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন। ছোট বেলা থেকেই তাঁর খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রচণ্ড। আজকের বিখ্যাত ক্রীড়া ক্লাব “আবাহনী ক্রীড়া চক্র”-এর তিনিই প্রতিষ্ঠাতা। দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে এই ক্লাবের জন্যে তিনি ফুটবল ও ক্রিকেট খেলোয়াড় সৃষ্টি, বাছাই এবং তাদের অনুশীলনের জন্য তিনি নিজেই সব দেখভাল করতেন। সবচেয়ে মজার বিশয় এই যে তিনি একজন দক্ষ সমাজ, সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন এবং জীবনের চলার পথে যার হাত ধরে জীবনটা শুরু করতে চেয়েছিলেন অর্থাৎ তাঁর সহধর্মীনি ছিলেন সেই সময়ের প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ “সুলতানা খুকু”/ ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই শেখ কামাল ও সুলতানা খুকু বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

শেখ কামাল দেশ মাতৃকার প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। ছিলেন দেশ প্রেমিক বাবার দেশপ্রেমিক সন্তান। তাই তো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ীতে বসে থাকেননি। ১৯৭১ সালের ১৫ শে মার্চ রাতেই বাড়ি থেকে চলে গিয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন সংগ্রামী আদর্শবাদী কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ৬৬ এর স্বাধিকার আন্দোলন ৬৯ এর গন আন্দোলন ও ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং সেনা প্রধান এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ কামাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই তরুণ মানুষটি থেমে থাকেননি। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে পড়াশোনার দিকে আবার ঝুঁকে পড়েন এবং সেই সাথে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন শেখ কামাল।

২৬ বছরের এক টগবগে তরুণ ছিলেন শেখ কামাল। তাঁর এই ছোট জীবন পরিধিতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উদীয়মান জ্বলজ্বলে তারা। তারুণ্যের প্রতীক। এই ২৬ বছরের জীবনে অনেক কিছু করেছেন তিনি। কিন্তু তাঁকে নিয়ে হায়েনাদের চক্রান্ত থেমে থাকেনি। তাঁর নামে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ এনে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে যা পরবর্তীতে টিকে থাকতে পারেনি। কারণ, ইতিহাস কখনও মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয় না। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বিখ্যাত অভিনেত্রী “ডলি জহুর” বলেছিলেন, আমি খুব কষ্ট পাই, অভিশাপ দেই, যখন দেখি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে চিরকাল মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত, কাল্পনিক অভিযোগের কথা শুনি। অনেকে জানেন যে, এসব মিথ্যা ও বানোয়াট। পাছে আওয়ামীলীগ সিল লেগে যায় এই জন্যে তারা এসব সত্যের বিষয়ে মুখ খোলেননি। আর এইসব ঘটনা বের করে আনার জন্যে মিডিয়ার ভূমিকাও দরকার। কারণ, এই মিথ্যাচারের মাধ্যম ও বাহন ছিল গণমাধ্যম ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ছোট বোনের বান্ধবীকে নিজের বোনের মতো করে গাইড করা, অনেক রাতে নাটকের রিহার্সাল শেষ হলে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার মত দায়িত্ববোধ যে তরুণের আছে, তার সম্পর্কে ধারনা লাভ করে কঠিন কিছু না। প্রেসিডেন্টের ছেলে হয়ে যার মধ্যে ছিল না অহংকার। পকেটে টাকা না থাকলে যিনি হেটে বাড়ি ফিরতেন। তরুণ বয়সে একজন ছেলের একটি মেয়েকে ভাল লাগতেই পারে। তাইতো ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন তার মতো একজন ক্রীড়াবিদকে। ঘাতকের আঘাতে তার প্রিয় সহধর্মীনির মৃত্যু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর লাশ মানুষকে দেখতে না দেওয়া, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘৃণা করতে শেখানোর যে অপচেষ্টা, শেখ কামালও অপচেষ্টার শিকার। যে লোক পয়সার অভাবে হেঁটে বাসায় ফিরত, সে লোক করবে ব্যাংক ডাকাতি? ইতিহাসকে কখনো চেপে রাখা যায় না। খুনিরা প্রথমে খুন করে, তারপর সেই খুনকে জায়েজ করার জন্যে খুন হওয়া ব্যক্তির নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ কামালের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে।

শেখ কামাল একজন দক্ষ, বিচক্ষণ সংগঠক ছিলেন তাইতো যুদ্ধের ময়দানে স্বাধীন বাংলার ফুটবল ম্যানেজার তানভীর মাঝার তান্নার সাথে যুদ্ধে প্রায় আলাপ হলেই উনি বলতেন, “তান্না, আমরা কি ফিরে যেতে পারব না? দেখে নিস, স্বাধীন হলে খেলার ছবিটাই বদলে দিব আমি”। তিনি তার কথা রেখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে আবাহনী যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আই এফ এ শীল্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে যায় তখন আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও তার মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইবোনদের সাথে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গমাতা বেগম মুজিব শেখ কামালকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে পিতার সাথে তার দেখা তেমন হতো না। তাইতো জেল গেটে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “বুবু তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা ডাকি?” এমন একজন মানুষকে নিয়ে আমরা কত প্রোপাগান্ডাই না করেছি!

শেখ কামালের মিথ্যাচার নিয়ে যখন অনেকেই না জেনে কথা বলে, তখনই হাসি পায়। যে ব্যাংক ডাকাতির কথা বলা হয়, সেইখানে দুষ্কৃতিকারীদের ধরতে পুলিশের সাথে শেখ কামালের বন্ধু ও সিনিয়ররাও যোগ দেন। তার সাথে ছিলেন বি.এন.পির ইকবাল হাসান টুকু। তার ড্রাইভার ছিলেন সেই টুকু। জাপার কাজী ফিরোজ রশিদ ছিলেন তার সিনিয়র, তিনিও ছিলেন সেই জীপে। ঐ সময়ের “দৈনিক মর্নিং নিউজ” এর সাংবাদিক প্রয়াত এবি এম মুসা পরদিন প্রত্রিকায় এর সত্যতা প্রকাশ করেন।

পৃথিবীতে ভাল মানুষকে ভালো কাজের জন্যে জীবন দিতে হয়। অনেক ধৈর্য ত্যাগ-তিতিক্ষা কষ্ট সহ্য করতে। বঙ্গবন্ধু পরিবার তার মধ্যে অন্যতম। এদেশীয় দালাল এবং বিদেশী শক্তি এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্তে ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। আজ যদি শেখ কামাল বেঁচে থাকতেন কেমন হতেন তিনি? এই প্রশ্ন মনের মধ্যে খুব জাগে। ২০১৬ সালের এ আধুনিক যুগে তিনি হতেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই তরুণ-সমাজকে আরও মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করতে কাজ করতেন। যে তরুণ তাঁর জীবনের ২৬ বছরে এত কর্ম-দীপ্ত ছিলেন, বেঁচে থাকলে হয়ত আরও কিছু করে যেতে পারতেন দেশের জন্যে। দেশের তরুণদের জন্যে। শেখ কামাল একজন ইয়ুথ আইকন। আজও, এখনও… । খুনিরা হয়তো তাঁর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তাঁর অবদানকে মুছে দিতে পারেনি। কারণ, হিরো’জ নেভার ডাই…।

শুভ জন্মদিন শেখ কামাল।

লেখক : ডাইরেক্টর, রেডিও ঢোল, এফএম ৯৪.০, ফাউন্ডার, দ্যা লাভলি ফাউন্ডেশন।

]]>
হলি আর্টিজান: ঘুম কি ভাঙলো? https://sherakantha.com/2017/07/02/%e0%a6%b9%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%98%e0%a7%81%e0%a6%ae-%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%b2%e0%a7%8b/ Sun, 02 Jul 2017 06:52:45 +0000 http://sherakantha.com/?p=122520 Continue reading হলি আর্টিজান: ঘুম কি ভাঙলো? →]]> তুষার আবদুল্লাহ : চমকে ওঠার দিন ছিল আজ। চমকে উঠেছিলেন উঁচুতলার মানুষেরা। সমাজে কর্কট রোগ দেখা দিয়েছে, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, খবরটিকে খবর হিসেবেই দেখছিলেন তারা। ভেবেছিলেন কর্কট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে কেবল নিচুতলার মানুষ। নিচের সমাজ। নিজেরা নিজেদের প্রবোধ দিয়ে বলছিলেন- তারা, তাদের সন্তানরা যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে সেখানে জঙ্গিবাদ নামের কর্কট রোগের প্রবেশ ঘটেনি। অথচ নিরব ঘাতক এই রোগটি তাদের অন্দরে গিয়ে নিরাপদ বসত গড়েছিল। এই রোগের উপসর্গের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না, এমন কথা বলা যাবে না। সবাই উপসর্গ ধরতে পেরেছিলেন। তবে ধারণা করে উঠতে পারেননি উপসর্গটি মরণব্যাধিতে রূপ নেবে। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সুশীল নামের ‘সেলোফিন পেপার’ আবৃত সমাজ একটি ধারণার প্রচারক ছিল-জঙ্গি মানেই ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থী। তাদেরই ধর্ম বিষয়ে কট্টর অবস্থান। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা সেই প্রচারপত্র বিলিকারকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। তারা বিব্রত হয়েছিলেন, হয়েছিলেন ভীত। কারণ জঙ্গি হামলায় জড়িতরা সমাজের উঁচুতলার সন্তান ছিল। তারকা খচিত ইংরেজি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তারা। বিদেশে শিক্ষারতও ছিল কেউ কেউ। বিশেষ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও সন্দেহ করা হচ্ছিল। জঙ্গিরা হলি আর্টিজানে ওই রাতে যারা উপস্থিত ছিলেন- দেশি, বিদেশি তাদের ২২ জনকে হত্যা করেছে। ছেড়ে দিয়েছে কাউকে কাউকে। সেনা অভিযানের আগে বা অভিযানে জঙ্গিদের মৃত্যু ঘটেছে। এই জঙ্গিরা কারা তা কি লুকানোর একটি চেষ্টা ছিল? প্রাথমিক ভাবে তাদের যে নাম গুলো বলে পরিচয় দেওয়া হচ্ছিল তাতো সমাজকে আবার বিশ্বাস করে নিতে হতো। প্রয়াস ছিল ওই নিচুতলা থেকে অঙ্কুরিত জঙ্গিরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত।
সেই প্রয়াসকে নস্যাৎ করে দেন হলি আর্টিজান সংলগ্ন বাড়ি থেকে তোলা কোরিয়ান ভদ্রলোকের ছবি। ফেসবুকে সেই ছবি তুলে দিলে প্রকাশ হয় সমাজের উঁচুতলা আক্রান্ত কর্কটে। জঙ্গিদের মধ্যে যারা মারা গেছে তাদের নিয়েতো পরিবার বিব্রত ছিলই। যাদের মৃত্যু হয়েছে জঙ্গি হামলায় তাদেরও কাউকে কাউকে নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। যে তরুণরা সরে পড়তে পেরেছিল সেই রাতে বা ভোরে, প্রকাশিত ছবিতে তাদের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, তারাও উঁচুতলার। তাদেরকে কালোদাগ মুক্ত রাখতেও চলেছে সুশীল কৌশল ও রাজনীতি। কোনও কোনও গণমাধ্যমও জড়িয়ে পড়েছিল এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে। শুরুতে যে বলছিলাম চমকে যাওয়ার কথা। সেই চমকই অনেক সুপ্ত পরিবারকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা দেখতে পেলো-তাদের সন্তানেরা অনেকদিন পরিবার ছাড়া। তাদের কোনও হদিস নেই। কোনও কোনও পরিবারের সন্তানরা স্ত্রী, সন্তান, স্বামীসহ নিখোঁজ ছিলেন। এই নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়াদের খোঁজ পড়ে যায় হলি আর্টিজান হামলার পর থেকে। নিখোঁজদের যে তালিকা পাওয়া যায়, এবং কোনও কোনও নিখোঁজ যে ভিডিও চিত্র পাঠিয়েছিল-তারা সকলেই অভিজাত বা কথিত শিক্ষিত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। এই সময়টায় টেলিভিশনের টকশো, পত্রিকার কলামে শ্রেণি বৈষম্য, বৈষম্যমূলক শিক্ষা, শিক্ষার নৈতিকতা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিস্তার পর দিস্তা আলোচনা হয়েছে। কৌতুককর বিষয় হচ্ছে সেই আলোচনায় উঁচুতলার প্রতিনিধিরাই অংশ নিয়েছেন। এই প্রয়াসে তাদের সাফাই গাইতে যেমন দেখা গেছে, তেমনি আলোচনা গুলোকে তারা আতঙ্ক কাটিয়ে উঠবার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যে কাজটি এই একবছরেও করা হয়নি- সেটি হলো আমাদের শিক্ষার ব্যবস্থার সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া। শিক্ষা যে সামাজিক বৈষম্য তৈরির আতুঁড় ঘর। সেই আতুঁড়টি ভেঙে ফেলা। একই সঙ্গে সমাজের যে শ্রেণিটির কাছে সুনামের মতো সম্পদ আছড়ে পড়ছে তাতে বাঁধ দেওয়া। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নৈতিকতার মোড়কে আগামী দিনের নেতা হিসেবে তৈরি করা।

এই পথে আমরা না এগিয়ে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে হেফাজতি ফুঁ দিয়ে বসলাম। আমাদের সন্তানরা হলি আর্টিজান দেখার পরেও মহল্লায় মহল্লায় গ্যাং তৈরি করতে শুরু করলো। মহল্লার দখল নিতে সমবয়সী প্রতিপক্ষকে হত্যা করার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে বসলো। আমরা ডুবে থাকলাম দেশে আইএস আছে আইএস নাই খেলাতে। একবছরের আমলনামা ঘাটলে দেখা যাবে আমরা শুধু সময়ের অপচয় করেছি। নিজেরা নিরাপত্তা ক্যামেরায় সেলফি তুলে নিরাপদ বলে ঢেকুঁড় তুলে গেছি মাত্র। অথচ আমাদের ভোগের বেহজম সমাজে, রাষ্ট্রে কর্কট রোগকে আরো গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা আছি ভোগের ঘুমে। সাম্প্রতিক ‘রেইনট্রি’ বিস্ফোরণও আমাদের সেই ঘুম ভাঙাতে পারেনি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

]]>
‘আগের চেয়ে ভালো’ https://sherakantha.com/2017/07/02/%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8b/ Sun, 02 Jul 2017 06:51:38 +0000 http://sherakantha.com/?p=122517 Continue reading ‘আগের চেয়ে ভালো’ →]]> গোলাম মোর্তোজা : ‘অমুক আমল ভালো ছিল’- ছোট বেলায় শুনেছি, নিশ্চয় অনেকেই শুনেছেন। যিনি বলেন তার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। যাবতীয় সংকট, দুঃখ- কষ্ট যেহেতু বর্তমান সময়েই মুখোমুখি হতে হয়, ফলে মানুষ ভাবতে ভালোবাসে যে অতীতটা ভালো ছিল। যে সময়টা চলে যায়, সেটাই ভালো মনে করে আনন্দ পায়। সত্যিটা যদিও তা নয়। বর্তমানটাই বাস্তব।
গত কিছু বছর ধরে শুনছি ‘আগের চেয়ে ভালো’! এ কথা দিয়ে আসলে কী বোঝানো হয়? ‘আগে’ মানে ‘কত আগে’? শায়েস্তা খাঁ’র আমল নিশ্চয়ই নয়। আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভবত ‘আগে’ বলতে ২০০১ থেকে ২০০৬’র বিএনপি- জামায়াত এবং ২০০৭-০৮ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালকে বোঝাচ্ছে। বা তার আগের অন্যান্য সরকারের সময়কেও বুঝিয়ে থাকতে পারে।
সেই সময়কালের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের দুই মেয়াদের গত আট সাড়ে আট বছরের সময়কাল নিয়ে কিছু তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে।
১. ‘আগে’র চেয়ে মানুষের আয় বেড়েছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বাজেটের আকার বিশাল হয়েছে। নতুন রাস্তা না হলেও, কিছু রাস্তা চারলেন হয়েছে, হচ্ছে, কিছু সেতু হয়েছে, পদ্মা সেতুসহ আরও কিছু ছোট- বড় সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে খাদ্য উৎপাদন। এসব ক্ষেত্রসহ নিশ্চয় আরও কিছু ক্ষেত্রে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, অন্য যেকোনও সরকারের যেকোনও কাজের চেয়ে ভালো কাজ।
২. আগে মোটা চালের কেজি ছিল ২২ টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাম বেড়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার কারণে। তখন মোটা চালের কেজি হয়েছিল ৩৬- ৪০ টাকা। ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারও নিয়ন্ত্রণে আসে। দেশে মোটা চালের কেজি নেমে আসে ২৬ টাকায়। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মোটা চালের কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে থাকে। ২০১৭ সালে এসে দাম বাড়তে বাড়তে ৫৫ টাকা হয়।
মোটা চাল ক্রেতাদের আয় ২০১৬ সালে যা ছিল, ২০১৭ সালেও তাই আছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৪ টাকা।
মধ্যবিত্তের আয় এবং চালের দামের হিসেবটাও এমনই। শুল্ক কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির পর দাম কেজিতে ৬ টাকা কমবে, জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ৫০-৫৫ টাকার চাল ৬ টাকা কমে হবে, ৪৬-৪৯ টাকা কেজি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ চালের দামের ক্ষেত্রে কী, তা বলার সুযোগ আছে!
২. চালের মজুদ ‘আগে’ থাকতো কমপক্ষে ৬ লাখ মেট্রিক টন। তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। চিত্রটা যে ‘আগের চেয়ে ভালো’ নয় বাজারই তো বলছে।
৩. খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এবার আমদানি করা চাল- গমের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এই খাদ্যমন্ত্রী ‘আগে’ পোকায় খাওয়া মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত গম আমদানি করেছিলেন। তার জন্যে কোনও শাস্তি পেতে হয়নি তাকে।
এবার যদি সত্যি পচা গম- চাল আমদানি করা না হয়, তাহলে বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’!
৪. বাংলাদেশে তো নয়ই, সারা পৃথিবীর কোথাও আজ পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়নি। বাংলাদেশে হচ্ছে। প্রতি কিলোমিটারে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ সাধারণ বিষয়!
যেখানে কিলোমিটার প্রতি ভারতে খরচ ১১-১৩ লাখ, চীনে ১৩-১৬ লাখ, ইউরোপ- উত্তর আমেরিকায় ৩৫ লাখ টাকা।
এত টাকা খরচ করে বাংলাদেশে ‘আগে’ কখনও রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি।
পদ্মাসেতুর বাজেট ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। এখন ২৮ হাজার কোটি টাকা। আরও কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মাসেতু। ৩৫০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার ১২৫০ কোটি টাকাতেও শেষ হচ্ছে না।
তবুও বলব ‘আগের চেয়ে ভালো’!

৩. ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, উৎপাদন ৭৫০০ থেকে ৮৫০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। পরিস্থিতি ‘আগের চেয়ে ভালো’।

দাম বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেওয়া লুটপাটের রেন্টাল- কুইক রেন্টাল নীতিতে চলেছে সরকার। তেলের দাম, ক্যাপাসিটি ট্যাক্স, অধিক মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা- সব ক্ষেত্রে নজীরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বিএনপি- জামায়াত সরকারের সময়ে ‘খাম্বা দুর্নীতি’ ছিল তুমুল আলোচিত- সমালোচিত বিষয়। রেন্টাল- কুইক রেন্টালের দুর্নীতির কাছে, যা কিছুই না।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৯ সাল থেকে কমতে শুরু করেছে। ২০০৭-০৮ সালে যে তেলের দাম ছিল ১২০ ডলার, ২০১৬ সালে তা ৩০ ডলারে নেমে এসেছিল। দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি। তেলের দাম কমার সুফল সরকার পেয়েছে, জনগণ পায়নি। সরকার আর জনগণ আলাদা হয়ে গেছে, অদ্ভুত শোনালেও অসত্য নয়।

উৎপাদন এবং লোডশেডিং বিবেচনায় অবশ্যই বলা যায় ‘আগের চেয়ে ভালো’। দাম, অনিয়ম- দুর্নীতি বিবেচনায় বলতে হবে ‘আগের চেয়ে বেশি অনেক বেশি, আগের চেয়ে ভালো নয়।’

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে ভালো যোগ্য মানুষ আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তারা ভালো কাজ আগেও করতেন, এখনও করেন। অন্যায়- অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আগেও ছিল, এখনও আছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটাতেন, এখনও ঘটান।
আগে কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নামে অপহরণ- গুমের ঘটনা এত ঘটেনি, এখন যত ঘটে। আগে শেখ হাসিনার জনসভায় পুলিশ গুলি করে ২৫/৩০ জন মানুষকে হত্যা করেছে। পেট্রোল বোমার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছে। সন্ত্রাসও আগের চেয়ে বেশি হয়েছে, মানুষ হত্যাও বেশি হয়েছে। তবে র‌্যাব কয়েকজন সদস্য কর্তৃক সাত জনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। পুলিশ মানুষের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে, এমন প্রমাণ আগে কখনও পাওয়া যায়নি। অপহরণকারী মাইক্রোবাসের পেছনে পুলিশের গাড়ি আগে কখনও দেখা যায়নি। গ্রেফতার করার কয়েক মাস পর ‘আজ গ্রেফতার’ দেখানোর অভিযোগ অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বহুগুণ বেশি। জঙ্গি পালনের অভিযোগ আগে ছিল, হলি আর্টিজানের আগে পর্যন্ত জঙ্গি জিইয়ে রাখা, আইএস- আল কায়েদা আছে প্রমাণ করার চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কোনও বিবেচনায় বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’?

৫. লক্ষ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ আগে কখনও হয়নি। আর্থিক খাতে ‘পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি’’র ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এতটা রুগ্‌ণ অবস্থা আগে কখনও হয়নি। আগে কখনও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়নি। সুইজ ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা আগে কখনও দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়নি। ড. আতিউর রহমানের মতো এতটা এমন গভর্নর আগে কখনও দেখা যায়নি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার কোনও সুযোগ তো দেখি না!
৬. বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। দেশীয় অর্থে বাজেট, নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নিয়ে কথার শেষ নেই। এখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ যে ৪০ হাজার টাকা, সে কথা বলতে শোনা যায় না। ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৬ হাজার টাকা, সে কথাও ‘উন্নয়ন’র গল্প বলাওয়ালারা বলেন না।
ঋণের পরিমাণ ‘আগের চেয়ে বেশি’ আর ‘আগের চেয়ে ভালো’ নিশ্চয় এক অর্থ বহন করে না!
৭. এরশাদ আগে কখনও ক্ষমতা দখল করার পক্ষে এভাবে কথা বলতে পারেনি। ‘ আমি ক্ষমতা নিতে চাইনি, বাধ্য হয়ে নিয়েছি’ এত বড় অসত্য সংসদে দাঁড়িয়ে বলেনি। রাজনীতিবিদদের জন্যে অত্যন্ত অসম্মানজনক অসত্য বলার পরও সংসদে কেউ প্রতিবাদ করেননি। পতিত স্বৈরাচারের এমন আস্ফালন আগে কখনও দেখা যায়নি।
এটাকে কী ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলবেন?
৮. বিনা ভোটের ‘হ্যাঁ – না’ নির্বাচনসহ এদেশের মানুষ ভোটারবিহীন নির্বাচন অনেক দেখেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন, যে নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত, এমন নির্বাচন আগে কখনও দেখেননি।
সংবিধান রক্ষার নামে ভোটার বিহীন নির্বাচনের কথা আগেও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বলা হয়েছে, এখনও বলা হচ্ছে।
কোনও বিবেচনাতেই এই নির্বাচনকে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার সুযোগ নেই।
৯. সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়মিত ফাঁস আগে কখনও হয়নি। নির্দেশ দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আগে কখনও ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ৯০% -৯৫% শিক্ষার্থীর পাস নম্বর না পাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি। পাঠ্য পুস্তক এমন সাম্প্রদায়িকরণ কোনও সামরিক সরকারও করেনি। বিএনপির জামায়াত, আওয়ামী লীগের হেফাজত পৃষ্টপোষকতা- কোনটাকে ভালো বা কম খারাপ বলবেন?
শিক্ষা ব্যবস্থার এমন করুণ পরিণতিকে নিশ্চয় ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না!
১০. কৃষক খাদ্য উৎপাদন বিরতিহীনভাবে বৃদ্ধি করছে। এখানে সরকারের খুব বেশি কোনও কৃতিত্ব নেই। কৃষককে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার দায়ে অভিযুক্ত সবগুলো সরকার। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সরকারের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ থাকে। সাম্প্রতিক হাওর এবং পাহাড়ের দুর্যোগে নজীরবিহীন অযোগ্যতা, দায়- দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। অন্য সরকারকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের অতীতের সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে, বর্তমান অন্ধকার।
২০-২৫ লাখ মেট্রিক টন চাল যে বছর আমদানি করা হয়, সে বছরই ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রফতানি করা হয়। চাল উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, রফতানিকারকও কৃতিত্ব নেওয়ার এই চালাকিকে আর যাই হোক ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না।
১১. তাহলে ‘আগের চেয়ে ভালো’ কী? ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের হিসেব ‘আগের চেয়ে ভালো’। মূল্যবৃদ্ধির অসহনীয় প্রভাবে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্ক জনজীবনে কোনও সুফল বয়ে আনতে পারছে না। সন্দেহ তৈরি হচ্ছে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের মারপ্যাঁচ নিয়ে। উৎপাদন বৃদ্ধির কৃতিত্ব কৃষকের, রিজার্ভ বৃদ্ধির কৃতিত্ব নিজ উদ্যোগে বিদেশে যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের। তারাও কৃষক, কৃষকেরই সন্তান। কৃষি উপকরণ সরবারাহে সরকারের কিছুটা কৃতিত্ব থাকলেও, প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনও কৃতিত্ব নেই, উল্টো দায় আছে অনেক।
আগের মত সরকার বিরোধী আন্দোলন নেই। শত অন্যায়ের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয় না। রামপালবিরোধী আন্দোলনসহ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার যেকোনও আন্দোলন দমন করা হয় আগের চেয়ে অনেক গুণ কঠোরভাবে। বুদ্ধিজীবীরা বিবেক বিক্রি করে আকসকামিতা- তোষামোদীতে আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ফলে হাজারও জনবিরোধী নীতি নিয়েও সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সমস্যা হচ্ছে না।
‘আগের চেয়ে ভালো’- তেমন কিছুর সন্ধান পাওয়া না গেলেও, ক্ষমতায় টিকে থাকা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

]]>
ক’জন দেখেন ঈদের নাটক? https://sherakantha.com/2017/07/02/%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%88%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%95/ Sun, 02 Jul 2017 06:49:19 +0000 http://sherakantha.com/?p=122514 Continue reading ক’জন দেখেন ঈদের নাটক? →]]> সারওয়ার-উল-ইসলাম : এবার ঈদের আগের দিন অর্থাৎ ২৫ জুন রাত সাড়ে ন’টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন হ‌ুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘একদিন হঠাৎ’ পুনঃপ্রচার করে। নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় যে, কতবার প্রচারিত হয়েছে বিটিভি কর্তৃপক্ষের হিসেবে আছে কিনা সন্দেহ। এ রকম হাসির নাটকের সংখ্যা কমই আছে। নেই সংলাপে ‘ছ্যাবলামি’ আর অতিকথন। সাবলিলভাবেও যে হাসির ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘একদিন হঠাৎ’ নাটকটি।

আমার দুই মেয়ে বাংলাদেশের নাটক খুব একটা দেখে না। এর জন্য বকাঝকাও কম করি না। ঈদের হাসির নাটক দেখে হাসতে পারে না ওরা, জোর করে হাসানোর জন্য পরিচালকসহ অন্যদের নানা রকম কটু কথাও বলে। এবার ‘একদিন হঠাৎ’ নাটক প্রচারের সঙ্গে-সঙ্গে দু’জনকে ডেকে পাশে বসালাম। প্রথমটায় খুব বিরক্ত দু’জন, কেন বসালাম। তারপরে আবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক! পরে নাটকের ভেতরের কিছু ঘটনা আগেই বলে দেওয়ায় অনিচ্ছা থাকার পরও বসে পড়লো। আস্তে আস্তে দেখলাম ওরা বেশ মজা পেয়ে যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হাসির ঝিলিক দেখে বাবা হিসেবে এই প্রথম ব্যর্থ হইনি ভাব করে ভারিক্কি চালে বললাম, সামনে দেখবি হুমায়ুন ফরিদী আরও কী কী করে।
পরের ঘটনা হচ্ছে, নাটক শেষ না করে কন্যাদ্বয় টেলিভিশনের সামনে থেকে ওঠেনি।
এ গল্পটি শোনানোর কারণ এ জন্য যে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঈদে কোনও চ্যানেলের নাটক দেখে খুব একটা আনন্দ পাওয়ার কথা শুনি না। হয় সংলাপে ছ্যাবলামি, দৃশ্যায়নে সমস্যা, অতিঅভিনয়ে জর্জরিত আর কাহিনিতে ধারাবাহিকতার অভাব। কোনও রকমে গোঁজামিল দিয়ে শেষ করা।

বিষয় হচ্ছে, কেন বর্তমানে আমাদের ঈদের নাটক টানতে পারছে না দর্শকদের? শুধু ঈদের নাটকই বা কেন বলি, সাধারণ সময়েও নাটক টানতে পারছে না। তাই টিভি রিমোট ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের চ্যানেলে।
এ প্রসঙ্গে অনেক রকম কথা শোনা যায়। আমাদের নাটক এখন আর পরিচালকদের হাতে নেই। সেটা চলে গেছে এজেন্সির হাতে। নাট্যকার বা লেখকেরাও অসহায়। তারা যে কাহিনি বা চিত্রনাট্য করে দিচ্ছেন, তা আমূল পাল্টে ফেলছে এজেন্সির লোকজন। এই যদি হয় নাটক তৈরির অবস্থা তা হলে তো কিছুই বলার নেই।

একসময় বিষয়টা ছিল এরকম, নাট্যকার নাটক লিখবেন। নাট্যকার দেখাবেন পরিচালককে। পরিচালকের গল্প পছন্দ হলে সেটা বানানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। পরিচালক বানানোর পর চ্যানেলে জমা দেবেন। চ্যানেলের প্রিভিউ কমিটি সেটা দেখার পর নির্বাচন করবে। ভালো হলে প্রচারিত হবে। কখনও সামান্য কারেকশনের প্রয়োজন হলে পরিচালককে বলে কারেকশন করে নাটকটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন বেশির ভাগ চ্যানেলেই নাকি নেই। তবে দুই/একটি চ্যানেল এখনও সেই মহৎ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি ধরে রেখেছে। তাদের সাধুবাদ দিতেই হয়। তাদের জন্যই এখনও এই আকালের সময় দুই/একটি ভালো টেলিফিল্ম বা নাটক কিছু রুচিশীল দর্শককে ধরে রাখতে পেরেছে।

তবে এক্ষেত্রেও একটি সীমাবদ্ধতার কথা শোনা যায়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটকের বা টেলিফিল্মের বাজেটটি নির্ধারণ করে দেন। এক ঘণ্টার নাটকের জন্য বলা হয় এক লাখ ষাট থেকে আশি হাজারের মধ্যে বানাতে হবে। তা হলে কী দাঁড়ালো? গল্পের ডিমান্ড অনুযায়ী কি নাটক বাবানো সম্ভব? চরিত্র কমাতে হবে। লোকেশন পরিবর্তন করতে হবে। আউটডোরে একেবারে না যেতে পারলেই পরিচালক বেঁচে যাবে। এর মানে হচ্ছে পরিচালককে হাত পা ধরে নদীতে ফেলা আর কী। তারপর সাঁতরে তীরে ওঠে আসতে হবে। যদি জীবনে টিকে থাকতে চাও।

এখন যে পদ্ধতিতে নাটক কেনাবেচা হয় সেটা আলুপটল কেনাবেচার চেয়েও খারাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নাকি কিছু করার নেই। হতাশ হতে হয় কথাটা শুনলে।
এখন ঈদের নাটক কেনাবেচা হয় এজেন্সির মাধ্যমে। একেকটা এজেন্সি মানে নাটকের আড়ত। তারা চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে চ্যানেলের সময় কিনে নেয়। সেই সময়টায় ইচ্ছে করলেই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের পছন্দের নাটক চালাতে পারবে না। কারণ তারা অগ্রিম স্টেশনের সময় বিক্রি করে দিয়েছে। বিনিময়ে তারা তাদের সময়ের মূল্য পেয়ে যাবে। কখনও অগ্রিমও পেয়ে যায়।
যেমন ধরা যাক, রজনীগন্ধা নামে একটি এজেন্সি এবার ঈদে দশটি চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলে ঈদের সাতদিনের নাটক চালানোর সময় কিনে নিয়েছে। দামদস্তুর করে টাকার হিসেবটাও চ্যানেলের সঙ্গে ঠিক করে ফেলেছে। এখন তারা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে। কখনও নাট্যকাররা সেই এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে তাদের গল্প জমা দেয়। গল্প ভালো লাগলে টাকা দিয়ে কিনে নেয় এজেন্সি। না ভালো লাগলে অর্থাৎ তারা যেই মানের নাটক চায়, হাস্যরস সুড়সুড়ি, কাতুকুতু মার্কা গল্প হলে ভালো, না হলে নাট্যকারকে বলে সেই ধরনের গল্প নতুন করে লিখিয়ে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক বানানো শুরু করেন। এভাবে একেকটা এজেন্সি দুই থেকে তিন শ নাটক বানানোর কাজে নেমে পড়ে প্রতি ঈদে। এবার বিজ্ঞাপন পাওয়ার বিষয়। বিজ্ঞাপনদাতাদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ থাকে এসব এজেন্সির। দেখা যায় চ্যানেলের এক খণ্ড নাটক প্রচারের সময়ের দাম ঈদের কারণে চার লাখ টাকা। এজেন্সি সেই নাটকের ফাঁকে ফাঁকে যে বিজ্ঞাপন ঢোকায় তার মূল্য সাত থেকে আট লাখ টাকা। এক নাটকেই থাকছে তিন থেকে চার লাখ টাকা। এর মধ্যে এক নাটকে নাট্যকার-পরিচালক-শিল্পীসহ প্রোডাকশন খরচ বাবদ দেড় থেকে দুই/লাখ টাকা বাদ। তারপর লাভ থাকছে এক নাটকে কম করে হলেও এক লাখ টাকা।

দর্শক দেখুক আর না দেখুক নাটকগুলো ঈদে বিভিন্ন চ্যানেল প্রচার করছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে চ্যানেলগুলোর ধর্ণা দিতে হচ্ছে না। তারা তাদের টাকা পেয়ে যাচ্ছে। আর এজেন্সি কামাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
একটা সময় ছিল চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরিচালকের কাছ থেকে নাটক কিনত। তারপর এজেন্সির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতো। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা কমিশনের মাধ্যমে চ্যানেলকে বিজ্ঞাপন দিত তখন। নাটকটি পরিচালকের কাছ থেকে কিনত দুই লাখ টাকা দিয়ে। আর নাটকের ফাঁকে ফাঁকে চ্যানেল বিজ্ঞাপন ঢোকাতো নাটকের মূল্যের তিন থেকে চার গুণ। এভাবে তারা ভালো মানের নাটক পেত। লাভটাও হতো বেশি। আর এখন টাকা চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে। নাটকের মান বলে কিছু থাকছে না।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে কেন এজেন্সির প্রয়োজন? আর এইসব এজেন্সির লোকজনই বা কারা? তারা কি নাটক বোঝে? নাকি ইয়াং জেনারেশনকে শেষ করার জন্য আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য শিল্প-সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার জন্য ইয়ো ইয়ো কালচার তৈরিতে ব্যস্ত তারা। ইয়ার্কি আর ফাজলামি মার্কা সংলাপ দিয়ে নাটক তৈরি করাই কি তাদের লক্ষ্য? নাটক কেন ভালো লাগে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে? তাদের জীবনের কথা, পারিবরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নাটকগুলো কেন আমাদের মা বাবা বোন ভাবি খালা চাচিদের আজো আলোড়িত করে, সেগুলো কি ওইসব এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগীরা বোঝেন?
আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের বেশির ভাগ চ্যানেলের কর্তা ব্যক্তিরা চান না দর্শকদের মন বুঝে নাটক নির্মিত হোক। যে নাটক দেখেই চুপ করে বসে পড়বে দর্শক। সংলাপ বা কাহিনির মোচড় তাদের নাটক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শককে বসিয়ে রাখবে টেলিভিশনের সামনে। তারা চান তাদের সময়ের দাম। দর্শকের মনের দামকে তারা থোরাই কেয়ার করেন।
দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেশে এসেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজ উদ্দিন আহমদ। ক’দিন আগে একটি বেসরকারি চ্যনেলের বিশেষ সম্পাদকীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান নাটক নিয়ে বলেছেন, ইয়ার্কি আর ফাজলামি হচ্ছে।
খুবই চিন্তার বিষয়, এই জন্য যে তার মতো স্বনামধন্য একজন মানুষ যখন এরকম অনুভব করেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না, কী হচ্ছে আমাদের চ্যানেলগুলোতে নাটকের নামে।

আমরা দোষ দেই আমাদের নতুন প্রজন্মকে। তারা দেশি চ্যানেল দেখে না। দেশি নাটক দেখে না। কিন্তু সত্যি কী তাদের ওপর এই দোষের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায়? তাই যদি হয় তবে কেন আমার কলেজ পড়ুয়া আর ইস্কুল পড়ুয়া মেয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‘একদিন হঠাৎ’ দেখতে বসে না শেষ হওয়া পর্যন্ত বসেছিল?
তবে এবার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ‘ছবিয়াল ঈদ রি-ইউনিয়ন’ আর অমিতাভ রেজা চৌধুরী ‘আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ’ নামে নাটকের দু’টি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের সাধুবাদ।
আমাদের চ্যানেল মালিকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা এখনও পারেন একটু চেষ্টা করলে ভালো নাটক নির্মাণ করতে। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা। সপ্তাহে না হোক মাসে একটা নাটক তৈরি করা শুরু করেন। দেখবেন আস্তে আস্তে দর্শক ফিরবেই বাংলাদেশের চ্যানেলে।
লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

]]>
নিরাপদ সীমান্ত চাই https://sherakantha.com/2017/07/02/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b8%e0%a7%80%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%87/ Sun, 02 Jul 2017 06:46:10 +0000 http://sherakantha.com/?p=122511 Continue reading নিরাপদ সীমান্ত চাই →]]> রুমীন ফারহানা : কিছুদিন আগে ওভালে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০১৭-এর ফাইনালে খেললো ভারত-পাকিস্তান। খেলা তেমন ভালো বুঝি না কিন্তু খেলা নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ভালোই উপভোগ করি। সদ্য সমাপ্ত এই খেলাটি নিয়ে মানুষের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ভারত বনাম পাকিস্তান বলে কথা। বাংলাদেশ ছাড়া আর যে অল্প কিছু দেশের খেলা থাকলে সাধারণত মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করি, তার অন্যতম হলো ভারত। ভৌগলিক দিক থেকে বিশাল এই দেশটির প্রায় পেটের ভেতরে অবস্থান বাংলাদেশের। মোটা দাগে ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত কিছু মিলও আছে দেশ দু’টির মধ্যে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান চিরকাল এদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। জনবহুল অথচ দরিদ্র এই দেশটি যুদ্ধরত বাংলাদেশকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, শরণার্থী শিবির খোলা থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য প্রচারণাসহ নানাভাবে সাহায্য করেছে। অবশ্য ভারতের দৃষ্টিতে এটি ছিল নিছকই পাকভারত যুদ্ধ। ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর সম্প্রতি বিষয়টি পরিষ্কারও করেছেন। তিনি বলেছেন ‘লঙ্কা জয় করে রাম যেমন তা বিভীষণকে দিয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ভারত তাই করেছে।’ যদিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যেকোনও কথায় যারা ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানি খুঁজে পান, তাদের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনও বক্তব্য শুনিনি।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের। যা ভেবেই ভারত তখন সাহায্য করে থাকুক না কেন, সাহায্য যে করেছিল, সেটাই ঐতিহাসিক সত্য। আমরাও এজন্য কৃতজ্ঞ। কিন্তু তারপরও ভারতের যেকোনও পরাজয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে অভিব্যক্তি আমি লক্ষ করি, তা বিস্ময়কর। ভারতের সঙ্গে কে জিতল, সেটি বড় কথা নয়, শুধু ভারতের পরাজয়টাই এদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের জয়ের তৃপ্তি এনে দেয়। অনেকেই বলবেন, খেলা তো খেলাই। খেলায় একটি দলকে সমর্থন বা অসমর্থন দিয়ে পুরো দেশের মনোভাব বোঝার চেষ্টা ঠিক নয়। কিন্তু এই খেলাকে উপলক্ষ করে মানুষ যে ভাষায় তার মনের ভাব প্রকাশ করে, সেটাকে কেবলই একটি ক্রিকেট দলের প্রতি বিরাগ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো—সিএনএন, আইবিএন ও দ্য হিন্দু পরিচালিত একটি জরিপে উঠে এসেছে, ভারতের ৪৮ শতাংশ মানুষ মনে করে পৃথিবীর আর সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশই তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের দেশে এমন কোনও জরিপ কখনও হয়েছে কিনা, জানা নেই। তবে সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দের অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের কথায়, লেখায় ও বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে; যেখানে মন খুলে মনের কথা প্রকাশ করে মানুষ। কিন্তু কেন এই বিরূপ মনোভাব? কাঁটাতারের বেড়া? সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ হত্যা? কাঁটাতারে ঝোলানো ফেলানীর লাশ? তিস্তার পানি? অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি? বাণিজ্য বৈষম্য? পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল? সাংস্কৃতিক আগ্রাসন? বাংলাদেশের বাজার দখল? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ? একতরফাভাবে বাংলাদেশ থেকে যা কিছু সম্ভব/অসম্ভব তা বাগিয়ে নেওয়া? নাকি এর সবই?

বিভিন্ন ধরনের অন্যায্যতা ছাপিয়ে ঘোষিত এই বন্ধু রাষ্ট্রটির নির্মমতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো কারণে কিংবা অকারণে কখনও গুলি করে, কখনও স্রেফ পিটিয়ে, অত্যাচার করে সাধারণ, নিরস্ত্র ও অনেক ক্ষেত্রেই নিরপরাধ বাংলাদেশিকে হত্যা করা। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতে গত এক দশকে প্রায় হাজার খানেক বাংলাদেশি বিএসএফের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র কিংবা অধিকারের পরিসংখ্যানও তাই বলে। বিখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এখন দক্ষিণ এশিয়ার বধ্যভূমি। যদিও এ সব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকে কখনোই যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও কেবল পরিসংখ্যান ছাপিয়ে তাদের দায় সেরেছে।
এমনকী ঈদের মাত্র ৫/৬ দিন আগে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোসালপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সপ্তম ও নবম শ্রেণিতে পড়া দুই কিশোর মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর আগের তাদের তীব্র শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে দাবি পরিবারের। ঠিক কী অপরাধে এই দুই কিশোরের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো, সেটা নিয়ে অবশ্য কেউই তেমন উদ্বিগ্ন নয়। বিজিবির প্রধান কাজ এখন পতাকা বৈঠক শেষে লাশ নিয়ে আসা, সেটি তারা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে। মজার বিষয় হলো ভারত থেকেও কিন্তু প্রচুর মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই সঙ্গে আসে গাঁজা, ফেনসিডিল, অবৈধ অস্ত্রসহ বহুকিছু। তবে বিএসএফ বাংলাদেশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে যেমন স্যুট অন সাইট বা দেখা মাত্র ঠাণ্ডা মাথায় গুলিনীতিতে চলে তেমন কিন্তু নিজের দেশের অপরাধিদের ক্ষেত্রে কিংবা বিজিবিকে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

নেপালের এক গোবিন্দ গৌতমের লাশ ভারতের কাছে যত ভারি হয়ে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশের হাজার খানেক লাশের মিছিল তার কানাকড়িও করতে পারেনি। গোবিন্দকে শুধু শহীদই ঘোষণা করা হয়নি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। কারণ গোবিন্দ গৌতমের পাশে পুরো নেপাল দাঁড়িয়েছিল, বাংলাদেশ যা কোনও ক্ষেত্রেই করেনি। এমনকী ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ২১ বিএসএফের একটি দল দুর্গাপুরে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে প্রায় ৫০০ গজ ঢুকে পড়ে ও নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। বিএসএফ সদস্যরা গ্রামবাসীর গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে যায়। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় মাছ ধরার অপরাধে বহু নিরীহ মানুষকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। এর কোনোটিরই কোনও বিচার না বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছে, না ভারত কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে।

সম্প্রতি দেখলাম, দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সিসি ক্যামেরা, ফ্লাশলাইট বসাতে গেলে বাধা দেয় বিএসএফ। এমনকী ইট-পাটকেলও নিক্ষেপ করা হয়। বাধা দেওয়ার কারণ হলো ভারতের দিকে তাক করে ক্যামেরা ও ফ্লাশলাইট বসানো হচ্ছে। শেষপর্যন্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যে পাচার, চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র, মাদক বন্ধে সীমান্তে এত সাবধানতা, এত মানুষের মৃত্যু সিসি ক্যামেরা বা ফ্লাশলাইট তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়ক হতো। ঘটনাটি প্রমাণ করে বাংলাদেশিদের বুকে গুলি তাক করা যতটা সহজ ও স্বাভাবিক ভারতের দিকে ক্যামেরা পর্যন্ত তাক করা ঠিক ততটাই কঠিন ও অসম্ভব।

যে কোনও অন্যায়, অন্যায্যতা, অবৈধতা আর বৈষম্যকে বিনা প্রতিবাদে ক্রমাগত মেনে নিতে থাকার একটাই অর্থ দাঁড়ায়। আর তা হলো এসব অন্যায়কে বৈধতা দান। দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের বৈধতা একটি ছোট দেশের সরকার নানা কারণেই তার বড় প্রতিবেশী দেশকে দিয়ে থাকে। বিশেষ করে বড় রাষ্ট্রটি যখন ছোট রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে, খোলাখুলিভাবে ক্ষমতাভোগের বা ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইতিহাস সাক্ষী—কোনও অন্যায়, অন্যায্যতাই শুভ পরিণাম বয়ে আনে না বিশেষত তাকে যদি বিনা প্রতিবাদে ন্যায্যতা দানের চেষ্টা করা হয়।

লেখক: সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি

]]>
ঘরে ঘরে অসংখ্য তসলিমা নাসরিন চাই https://sherakantha.com/2017/07/02/%e0%a6%98%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%98%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a6%82%e0%a6%96%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a4%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/ Sun, 02 Jul 2017 06:43:18 +0000 http://sherakantha.com/?p=122508 Continue reading ঘরে ঘরে অসংখ্য তসলিমা নাসরিন চাই →]]> জেসমিন চৌধুরী :  তসলিমা নাসরিন একসময় লেখার মাধ্যমে একের পর এক বোমশেল ফাটিয়েছিলেন। পূর্ব দিকে সূর্য ওঠার মতই সত্য সব কথাবার্তা বলেছেন, যা অধিকাংশের পক্ষে মেনেও নেওয়া যায় না, আবার ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায় না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যার অনেকটুকুকেই সত্যি বলে অস্বীকার করার উপায় থাকে না, যে কথাগুলো অমন করে আগে বা পরে কেউ বলার সাহস দেখাতে পারেনি।

যাদের চিন্তার ক্ষমতা আছে তারা তসলিমার কথাগুলো বুঝতে পেরেও তাকে মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই বলে, ‘তসলিমার সবই ভালো, শুধু ধর্ম নিয়ে অহেতুক কথাবার্তাগুলো না বললেই পারতেন’। অনেকে আবার বলেন ‘এদেশে মৌলবাদকে উস্কে দেওয়ার পেছনে তার ভূমিকা এতোই বিশাল যে তার লেখা উপকারের চেয়ে অপকার করেছে বেশি’। অনেকে বলেন ‘তিনি লেখার মাধ্যমে মূলত নিজের ওপরে ফোকাস আনার চেষ্টা করেছেন তাই তার বলা কথাগুলোর চেয়ে তার কৃত কাজগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক বেশি’। অনেকে বলেন, ‘বেগম রোকেয়াও তো সমাজ পরিবর্তনে নেমেছিলেন, কই তিনি তো ধর্ম নিয়ে কিছু বলেননি’।

ওপরের কথাগুলো বেরিয়ে এসেছে কিছুদিন আগে কয়েকজন শিক্ষিত চিন্তাশীল পুরুষের সাথে তসলিমা বিষয়ে এক ড্রয়িংরুম আলোচনা থেকে এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে আমার একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাসে বিভিন্ন নারী পুরুষদের মন্তব্য থেকে। তসলিমাকে নিয়ে এই আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে, ‘তিনি সাহসী এবং তার লেখার বিষয়বস্তু নিঃসন্দেহে বিবেচনার দাবি রাখে, কিন্তু তিনি একজন ফেইম সিকার যে নিজের লেখার বিষয়বস্তু থেকে নিজেকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে ধরেছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মকে আক্রমণ করেছেন শুধুমাত্র দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য’।
তসলিমার সাথে আমার পরিচয় মূলত তাকে নিয়ে আমার পরিচিতজনদের সমালোচনার মাধ্যমে। তিনি যখন লেখিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও খ্যাতি লাভ করেন সেই সময়টায় আমি ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত ছিলাম বিধায় তার লেখা আমার খুব একটা পড়া হয়নি কিন্তু তাকে নিয়ে সমালোচনা যত শুনেছি, ততই তার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়েছে। আমি তসলিমার ভক্তও না, তাই এসব কথা শুনে একমত পোষণ না করলেও আমি খুব একটা প্রতিবাদমুখরও হয়ে ওঠি না।
কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নারী পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যের অভিজ্ঞতা এবং এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা থেকে আমি বুঝতে পারি তসলিমা কেন বেগম রোকেয়া না হয়ে তসলিমা হয়েছেন, আমারও কেন তসলিমা হওয়া উচিৎ ছিল, কেন বাংলার প্রতিটি নারীর তসলিমা হওয়া উচিৎ আর কেনইবা তসলিমা নামটির উচ্চারণও আপনাদের জন্য বিছুটি পাতার সংস্পর্শ সদৃশ যন্ত্রণাদায়ক।

বেগম রোকেয়ার সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নারীর সামাজিক অবস্থানে অনেক পরিবর্তন এসেছে সত্যি, কিন্তু নারীমুক্তির মক্কা এখনও অনেক দূর। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রয়োজন দেখা দিয়েছে ভিন্ন ধরনের আন্দোলনের। বেগম রোকেয়ার মতো নারীরা মুক্তির যে ধাপে নারী সমাজকে তুলে দিয়ে গেছেন, আপনারা হয়ত চান নারী সেই ধাপেই বসে থাকুক অনন্তকাল, কিন্তু আমরা সবগুলো ধাপই বেয়ে উঠতে চাই। এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে উত্তরনের জন্য নারীকে আরো দুর্বার, আরো আরো গতিময় হতেই হবে। তসলিমাদের প্রয়োজন এখানেই।

বেগম রোকেয়া লড়েছিলেন নারীর শিক্ষার অধিকারের জন্য। আজ নারীশিক্ষার প্রয়োজনের কথা যদিও তাত্ত্বিকভাবে সর্বস্বীকৃত একটা ব্যাপার, বিশ্বজুড়ে এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন আজো সম্ভব হয়নি, এবং এই হতে না পারার পেছনের কারণগুলো নিয়ে লড়তে গিয়েই নারীকে আরো অনেক কিছুর বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়। কান টানলে মাথা আসবেই। নারী অধিকারের কথা বলতে গেলেই সমাজ, সংসার, ধর্মের কথা অবধারিতভাবে ওঠে আসে। তসলিমা নাসরিনদের জন্ম ঘটে সেজন্যই। মুচকি হেসে ফুল ছিটিয়ে বড় কোনও পরিবর্তন কখনও আসেনি, আসবেও না।

আমাদেরকে বলা হয় সুন্দরভাবে আন্দোলন করতে, ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা করতে, প্রচলিত কোনও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কথা না বলতে। কিন্তু আমরা যেসব মেয়েরা ভাবতে শিখেছি, নারীকে খাটো করে রাখা প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস আর সামাজিক প্রথাগুলো আমাদেরকে প্রতিনিয়ত কী পরিমাণ কষ্ট দেয় তা বিবেচনা করে দেখলে বুঝতে পারতেন কেন আমরা প্রায়ই ক্ষেপে যাই। আমাদের জায়গায় থাকলে হয়তো আপনিও ততটাই ক্ষেপতেন।

নারী আর পুরুষ- নাক, কান, হাত, পা, মগজ নিয়ে দু’জনেই মানুষ কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে তাদের যৌনাঙ্গের গঠন ও ব্যবহারের ধরন ভিন্ন। উভয়েই মানুষ হওয়া সত্ত্বেও শারীরিক কিছু গঠনের কারণে তাদের কাজকর্মের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে যা মোটেই আমাদের আন্দোলনের বিষয় নয়। পুরুষ চাইলে ধর্ষণ করতে পারে, নারী পারে না। পুরুষ পথের পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে, নারী পারে না। সেরকম জরুরি অবস্থা দেখা দিলে তাকে বসতে হয়, এবং তখন সেটাকে অশোভন ভাবা হয়। তসলিমা তার কোনও লেখায় নারীর পথের পাশে বসে প্রস্রাব করার অধিকারের দাবি জানিয়েছেন কিনা আমি জানি না। আমি নিজে এই দাবি জানাই না। পথের পাশে বসে প্রস্রাব করে পরিবেশ দূষণে পুরুষের সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। বরং আমার দাবি হচ্ছে সর্বত্র মূত্রালয়ের ব্যবস্থা করা হোক যাতে সকলেই সভ্য ভাবে কাজটি করতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে শোভন/অশোভনের হিসেবটাতে আমার ঘোর আপত্তি রয়েছে। প্রয়োজনেও নারীর পথের পাশে বসে পড়াটা অশোভন, এই ধারণার উৎপত্তি কোথায়? পুরুষ নারীকে অনাবৃত অবস্থায় দেখলে নিজের কামলিপ্সা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কাজেই জরুরি প্রয়োজনেও একজন নারীকে আড়াল আবডাল খুঁজতেই হবে, এবং তা না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, নিজের কিডনির বারোটা বাজিয়ে হলেও। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট- নারী ভোগের সামগ্রী এবং পুরুষ ভোক্তা। তা না হলে বিষয়টা উভয়ের জন্য সমান হবে না কেন? যা নারীর জন্য অশোভন তা পুরুষের জন্য অশোভন নয় কেন? মেয়েদের পথের পাশে বসাকে আপনি যতটা অশোভন ভাবেন, আপনার এই ভাবনার পেছনের কারণটা আমার কাছে তার চেয়ে অনেক বেশি অশোভন।

বেগম রোকেয়া সমাজকে মেনে নিয়ে সমাজের ভেতরে বসে সমাজকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন বলে আপনারা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কারণ কী জানেন? তিনি যেটুকু পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তাতে করে আপনাকে এক মিলিমিটার স্থানও নারীকে ছেড়ে দিতে হয়নি তাই আপনি খুশি ছিলেন। আজ নারী তার অবস্থানের পুরোটা অধিকার চাইছে, তাই আপনার ভালো লাগছে না। কিন্তু আপনার ভালো লাগা না লাগায় আমার কী আসে যায়? আমি কোণে বসে কাটিয়েছি হাজার বছর, এবার আপনার পালা। আমার অবস্থানে এসে কয়েকটি দিন কাটিয়ে দেখুন, বুঝে যাবেন খারাপ লাগা কাকে বলে।
একটা অল্প বয়েসী মেয়ে সেদিন ইনবক্সে মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘এমন একটা বই লিখতে পারেন না যেটা পড়ে মানুষের ব্রেইন ওয়াশ হয়ে যাবে? যেটা পড়ে তারা মেয়েদেরকে আর ছোট ভাববে না?’ মেসেজটা পড়ে খুব মন খারাপ হলো। একটা সতেরো আঠারো বছরের মেয়েকে, যার এই বয়সে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটার কথা, কেন এখন এসব কথা তার ভাবতে হয়? জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে ছোট করে রাখা না হলে সে কেন একজন অপরিচিত লেখককে এমন প্রশ্ন করে? কোনও ছেলেকে তো কখনও এই প্রশ্ন করতে শুনিনি।
আমি চাই ওই মেয়েটিও তসলিমা নাসরিনের মতো দুরন্ত হবে, কথা বলার সাহস দেখাবে। আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি মেয়ে হবে তসলিমা নাসরিনের মত অপ্রতিরোধ্য। যে মুখ তাকে নারী হিসেবে ছোট করতে চাইবে, সেই মুখ সে থেঁতলে দেবে। শোভন/অশোভনের হিসাবের যাঁতাকলে নিজের অধিকারকে, মর্যাদাকে বিসর্জন দেবে না। বিনিময়ে হয়তো অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনতে হবে তাকে, তবু সে তার নায্য পাওনার জন্য সাহসের সাথে লড়ে যাবে। প্রয়োজনে গৃহহারা হবে তবু বলে যাবে, ‘এই ঘরের অর্ধেকটা আমার ছিল, তুই জোর করে নিয়েছিস। তুই লম্পট। আমি নই, তুই ছোট, আমার থেকে অনেক ছোট’।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

]]>