মতামত – Sherakantha-সেরা কণ্ঠ https://sherakantha.com Just another WordPress site Sat, 01 Jul 2017 13:35:33 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=6.9.4 আমাদের রাজনীতিবিদগণ ও সুইস ব্যাংকের টাকা https://sherakantha.com/2017/07/01/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a6%97%e0%a6%a3-%e0%a6%93-%e0%a6%b8%e0%a7%81/ Sat, 01 Jul 2017 13:32:14 +0000 http://sherakantha.com/?p=122310 Continue reading আমাদের রাজনীতিবিদগণ ও সুইস ব্যাংকের টাকা →]]> চিররঞ্জন সরকার : আমাদের রাজনীতিবিদগণ ও সুইস ব্যাংকের টাকা সুবিখ্যাত সুকুমার রায় ‘খুড়োর কল’ নামক কবিতায় এক আশ্চর্য কল বা যন্ত্রের কথা বলেছিলেন। যে যন্ত্র ঘাড়ের কাছে লাগালে ওই খুড়োর ‘খাই খাই’ স্বভাব বেড়ে যায় এবং সে যা পায় তাই খেতে থাকে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ নেতা ওই খুড়োর কল নীতিই মেনে চলেন।
ভোটার নামে পরিচিত ‘গাধা’গুলোর মুখের সামনে প্রতিশ্রুতির মুলো ঝোলালেই এরা দৌড়ে এসে ভোট দিয়ে যায়। অনেক সময় আবার ভোটের দরকারও হয় না। এমন এক কল ফিট করা হয় যে ভোট ছাড়াই ‘নির্বাচন’ হয় এবং সেই নির্বাচনের সংসদ কাজও করে!
তারপরও দেশে মাঝে মাঝে ভোটের তোড়জোড় হয়। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কিছু ব্যক্তি নমিনেশন ‘বাগিয়ে’ নেয়। তবে এখন রাজনীতি যেহেতু বৃহৎ ব্যবসা ছাড়া আর কিছু নয়, তাই জনগণের ভোটের ভরসায় কেউ ভোটে দাঁড়ায় না। প্রার্থীর ভোট ব্যাঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করে শিল্পপতিরা।
বেশিরভাগ সময়ই সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ শিল্পপতি বা শিল্পগোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। বড় বড় ব্যবসা তারাই করে। অনেক সময় প্রচলিত নিয়ম-নীতি অগ্রাহ্য করলেও তাদের শাস্তি হয় না। তাদের বড় বড় অর্ডার পেতেও অসুবিধা হয় না।
অবশ্য সাধারণ মানুষ এসব জানতে পারে না। আর জানবেই বা কি করে? বাজারের যা পরিস্থিতি, চালের যা দাম, তাতে দুবেলা খাবার জোটাতেই হিমশিম, সেখানে চিন্তা করা তো বিলাসিতা! আর সবাই যদি চিন্তা করতে বা ভাবতে শুরু করে তাহলে রাজনীতিকদের তো কপাল পুড়বে! এটাও একটা নীতি যে সাধারণ মানুষকে সব সময় রুটি-রুজির সমস্যায় জর্জরিত করে রাখা!
ভাবার জন্য রয়েছেন মন্ত্রীরা। মন্ত্রীদের প্রধান ভাবনা কীভাবে চাকরিটা টিকিয়ে রাখা যায় আর মাল কামানো যায়! একবার মন্ত্রী হতে পারলে খাওয়া-পরার অভাব তো আর রইল না! সঙ্গে দেদার বিলাসিতা। শুধু কি নিজের? একই সঙ্গে আগামী কয়েক প্রজন্মের বসে খাবার ব্যবস্থাও পাকা করা চাই।
তারা জনগণের কথাও ভাবেন, কী করে জনগণকে ভুলিয়ে শান্ত রাখা যায়, কী করে পরবর্তী ভোটেও তাদের ভোটটা নিশ্চিত করা যায়। জনগণের জন্য কোন কাজটা করলে (মানে সেই খুড়োর কলের মুলো) জনগণ খুশি থাকবে এবং লাভের অঙ্কও অনেক বেশি হবে, তেমন কাজ তারা কিছু করেন বটে।
ধরা যাক কোনো এক জায়গায় রাস্তা নেই, সেখানে রাস্তা বানানো হলো। ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার কাজের ভার পেল। জনগণ রাস্তা পেয়েই খুশি। সে রাস্তা ভালো না খারাপ, কত খরচ-এসব অসাধারণ ব্যাপার তো আর সাধারণের জানার কথা নয়! জনগণ খুশি, ঠিকাদার লাভের অঙ্ক বুঝে নিয়ে খুশি, আর মন্ত্রী বা এমপি এক ঢিলে দুই পাখি মেরে দ্বিগুণ খুশি। একটা পাখি জনগণ কে খুশি রাখা, আরেকটা ঠিকাদারের কাছে লাভের অংশ বুঝে নেওয়া। এটা একটা অতি সামান্য উদাহরণ মাত্র।
রাজনীতির ব্যবসায় এই হলো সুবিধা, যতদিন গদিতে, লোকসানের কোনো ভয় নেই, বিনা ইনভেস্টে শুধু লাভ আর লাভ। ভয় শুধু একটাই একদিন অন্য কাউকে এই ব্যবসার ভার ছেড়ে দিতে হবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। এই ভয়েই জনগণের জন্য ভাবনাটা আসে, কি করলে গাধাগুলো আবার তাকেই ভোট দেবে। সে জন্যই তো নিরন্তর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আবার বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে তাদের প্রধান ও প্রথম কাজ হয় আগে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের দুর্নীতিগুলো খুঁজে বের করা। এর প্রধান উদেশ্য জনগণকে বোঝানো- আমরা সৎ, দুর্নীতিপরায়ণদের আমরা ছাড়ব না। আর জনগণ আগের দলের দুর্নীতির খবরে ব্যস্ত থাকলে, নতুন ক্ষমতায় আসা দলের দিকে নজর কম দেবে। ফলে নিশ্চিন্তে কামানো যাবে। গত চারদশক ধরে আমাদের দেশে এই ধারাই চলছে।
সত্যজিৎ রায় ভালো চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি রাজনীতিটাও ভালো বুঝতেন। ছোটদের সিনেমার মোড়কে কি দারুন রাজনৈতিক সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন- ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’, ‘হীরক রাজার দেশে’! ছোটবেলায় দেখা এসব সিনেমা এই বড়বেলায় আরও অনেক বেশি প্রিয় হয়ে গেছে-‘ও মন্ত্রীমশাই…, ষড়যন্ত্রী মশাই…’ বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে কি নিদারুণ সত্যি একটা লাইন!
আমাদের রাজনীতির মূল বিষয় কিন্তু মোটেই জটিল কিছু নয়। যে কোনো মূল্যে ভোটে জেতা আর ভোটে জিতে ক্ষমতায় দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য যত রকম নোংরা কাজ আছে করে যাওয়া। এটাই এক এবং একমাত্র কৌশলে পরিণত হয়েছে। দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়ে চলেছে এই নীতিকে সামনে রেখে। এর বাইরে দেশসেবা কথাটা-সেই খুড়োর কল!
ভোটের প্রচারে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দেয় ভুরি ভুরি। তাদের সবচেয়ে বেশি ঝোঁক, প্রতিপক্ষ দলগুলোর নামে বিষোদগার করা। নিজের দুর্নীতি আর ব্যর্থতার কথা তারা বেমালুম চেপে যায়। আর জনগণও অত্যন্ত সরেস। ঘুরে ফিরে সেই একই নেতানেত্রীদের চরণতলে তাদের আনুগত্য ঘোষণা করে যায়! সে যতো খারাপই হোক (তাইতো নিজামী-মওদুদ-সাকা চৌধুরীরাও আমাদের দেশে যুগের পর যুগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন)!
আজ পর্যন্ত এমন উদাহরণ খুব কমই দেখা গেছে যে, দুর্নীতির কারণে জনগণ কোনো নেতা বা নেত্রীকে ভোট দেয়নি! অদ্ভুত এই দেশ! এদেশে মেধাবী হয়েও চাকরি পাওয়া যায় না, কিন্তু একজন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত অপরাধী ব্যক্তিও কোনো মতে মন্ত্রী হয়ে অনেকের চাকরি দিতে পারেন। একটা ভালো কাজ তা সে যে দলই করুক, সমস্ত রাজনৈতিক দল সেটা সমর্থন করে প্রশংসা করেছে, এমন দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান ব্যক্তিরা চান না যে তার দলের সবচেয়ে সৎ ব্যক্তিটি মন্ত্রী হোক। যদিওবা হয়, তাহলে সবাই মিলে তাকে অযোগ্য-অথর্ব বানিয়ে দেওয়া হয়। সে কোনো কাজই করতে পারে না, তাকে করতে দেওয়া হয় না। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনীতিতে সততা বা সৎ মানুষের কোনো ভাত নেই।
এদেশের মানুষকে নিয়ে প্রহসনের কোনো শেষ নেই। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো বিজ্ঞাপন। রেডিও-টিভিসহ গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে নিরন্তর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে উপহাস করা হয়। যদিও এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, তবু একটু বলা দরকার।
যে দেশে বেশিরভাগ মানুষের দুবেলা খাওয়া জোটে না, অনেক মানুষ ফুটপাতে রাত কাটায়, সেখানে দুধ, স্ট্রবেরি, আপেল, পিচ ইত্যাদি দামি ফলের তৈরি তথাকথিত রং ফর্সা করার মুখে মাখার ক্রিম বা শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন কিংবা দামি মোবাইল সেট, টিভি ফ্রিজের বিজ্ঞাপন নিদারুণ উপহাস বা ব্যঙ্গ ছাড়া কি?
রাজনৈতিক নেতাদের বিজ্ঞাপনও একটা বড় প্রহসন। ভোটের প্রচারে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। সভা, মিছিল, লিফলেট, পোস্টার দেয়াল লিখন, বিলবোর্ড, জনদরদি নেতাদের বড় বড় কাট আউট আরও কত কি!
এটাও কি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে চরম উপহাস নয়? এই যে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয়, এটা দিয়েও জনগণের জন্য অনেক কিছু করা যায়। এলাকায় লাইব্রেরি স্থাপন, পুকুর সংস্কার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন দরিদ্রদের পুনর্বাসন আরও কতো কি আছে করার!
কিন্তু তা না করে, টাউট-বাটপারদের নগদ টাকা দিয়ে, প্রচারের নামে নগদ টাকা পানিতে ঢেলে এক আজব অপচয়ের পথে রাজনীতি আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। আর এই টাকা খরচ কে করে, কেন করে, এই টাকা ওঠে কি করে-সবই কিন্তু জনগণকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লুট করেই হয়।
আসলে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা (দুচারজন ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন) লুটপাট আর নিজেদের আখের গোছানো ছাড়া আর কিছুই করেন না। নিজেরা প্রতিনিয়ত যে দেশকে ‘ধর্ষণ’ করে চলেন অথচ সাধারণ মানুষের দেশপ্রেমের আবেগকে জিইয়ে রাখেন রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য। তাই ভোটের আগে এই দেশপ্রেমকেও উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়।
রাজনীতিবিদ নামক ব্যবসায়ীদের এই লুটপাটের টাকা কোথায় যায়? এই লুটপাটের টাকা সবার অলক্ষে চলে যায় সুইস ব্যাংকে। কিছু লোক ফুলেফেঁপে কলাগাছ হয়। তাদের আয় বাড়ে। সেই আয়ের হিসেবে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ে। শাসকরা উল্লসিত হন। আর এই ধনিকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরূপী বিভিন্ন দেশের শাসকরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে সাব্বাসী দেন।
‘বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে’ বলে জিগির তোলেন। কিন্তু বৈষম্যের শিকার, লুটপাটের শিকার, দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্র হওয়া মানুষগুলো কোনো দিশা পায় না। দেশের এই তথাকথিত প্রবৃদ্ধি গরিবের সমৃদ্ধি আনার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকাই রাখে না। রাখবে কি করে? লুটপাটকারীদের টাকা তো দেশেও বিনিয়োগ হয় না।
আমাদের দেশের জনগণের টাকা দেশে যত না তার থেকে বেশি আছে সুইস ব্যাংকে! আর আমরা গাধার দল ডাকাতের দলকে বিশ্বাস করে তাদের হাতে নিজেদের সর্বস্ব তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে সুখে জীবন কাটাতে চাইছি!
হ্যাঁ, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। বিকল্প চাই। এক লুটপাটকারীর বদলে আরেক লুটপাটকারী নয়, সত্যিকার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজটা এখনই শুরু করতে হবে। নেতৃত্ব দিতে হবে তরুণদেরকেই।
তা না হলে ফি বছর সুইস ব্যাংকে টাকার পরিমাণ বাড়বে। আমরা নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হবো!
চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।

]]>
বিশ্বায়ন বনাম ট্রাম্পায়ন https://sherakantha.com/2017/07/01/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%a8/ Sat, 01 Jul 2017 12:43:09 +0000 http://sherakantha.com/?p=122284 Continue reading বিশ্বায়ন বনাম ট্রাম্পায়ন →]]> সাহেদ আলম :গত সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ কিউবার সাথে ওবামার আমলে জোড়া লাগানো সম্পর্ক বলা চলে ছিন্ন করেছেন। আবার নানান রকম অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলেছেন। বলেছেন, কিউবার রাজনৈতিক সংস্কার হতে হবে এবং সেখানে স্বীকৃত পন্থায় নির্বাচন হতে হবে। জবাবে কিউবার বর্তমার রাষ্ট্রপ্রধান রাউল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ট্রাম্প তুমি তোমার নিজের দেশের মানবাধিকার নিয়ে চিন্তা কর, আর কিউবা নিয়ে লেকচার বন্ধ কর।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ফ্লোরিডার মিয়ামিতে এই ঘোষণা দিচ্ছিলেন, বলা বাহুল্য সেখানে উপস্থিত কয়েক হাজার কিউবান বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা বেশ উচ্ছ্বসিত ছিল। ট্রাম্পের এক সময়ের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লোরিডা সিনেটর মার্ক রুবিও প্রশংসা করেছেন ট্রাম্পকে এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য।
মার্ক রুবিও’র পূর্বপুরুষ এসেছিলেন কিউবা থেকে। মার্ক রুবিও’র বাবা সহ প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কিউবান নাগরিক সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৮২ সালের দিকে কিউবার তৎকালীণ ‘কট্টরপন্থী’ সমাজতান্ত্রিক নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন আমেরিকা পন্থী এই এক লাখ পঁচিশ হাজার নাগরিককে। ওঁরাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারায় বেশ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আর আইন প্রণেতাদের সাথে সংশ্লিষ্ট।
ওঁরা প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে কিউবা’র রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে সন্তুষ্ট ছিলেন না। রাজনৈতিক কারণেই যেহেতু দেশান্তরী হতে হয়েছিল সেই লাখো মানুষকে, তাই সেখানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ছাড়া কোন কিছুকেই বিকল্প মনে করেন না এই সব নাগরিকরা। যাই হোক, এই কিউবা-আমেরিকা দ্বন্দ্ব বেশ পুরনো এবং চাইলে এ নিয়েই বড় একটি লেখা লিখে ফেলা যাবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবা’র তরফে কোন রকম দ্বন্দ্ব বা উসকানি ছড়ানোর ঘটনা ছাড়াই এই ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘটনা বর্তমানে ট্রাম্পের রাষ্ট্রনীতির আরো একটি উলট-পালট মূলক সিদ্ধান্তের উদাহারণ। কেননা, দায়িত্ব নেয়ার এখনো ছয় মাস হয়নি, কিন্তু তিনি এরই মধ্যে অনেকগুলি ঘটনা ঘটিয়েছেন আগের বিশ্ব ব্যবস্থায়। সেগুলি আসলেই বিশ্ব ব্যবস্থার আগের স্থিতি অবস্থাকে একটি সংকটে ফেলে দিয়েছে। আর এ কারণেই, ট্রাম্পেরিকা, ট্রাম্পায়ান, ট্রাম্পি ওয়ার্ল্ড নামক শব্দগুলি নতুনভাবে সংযোজিত হয়েছে সময়ের ডিকশনারিতে।
কিউবা’র সাথে এই সম্পর্ক ছিন্ন করার আগের সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে বেশ বড় ধরনের একটি গড়বড় করে ফেলেছে ট্রাম্প প্রসাশন। তার আগের সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটো নিয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর আগের সাধারণ রীতি নীতি ভঙ্গ করে ফিলিপাইনের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট এর সাথে ফোনালাপ, উত্তর কোরিয়ায় নতুন যুদ্ধের হুমকি এগুলো তো আছেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব বলয়ে থাকা জাতিসংঘ বেকায়দায় ফেলা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সহায়তামূলক চুক্তি নাফটা স্থগিতের ঘোষণাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপে, আগের প্রচলিত শব্দ গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন শব্দের কার্যকারিতা এরই মধ্যে বেশ ব্যাপক ভাবে খর্ব হয়েছে। সেগুলি নিয়েই এই আলোচনা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর প্রথম বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে গিয়ে বড় বাণিজ্য হয়েছে তার। আগামি ১০ বছরে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি হয়েছে সৌদি আরবের সাথে। কিন্তু এর পর পরই সৌদি আরব, তার প্রতিবেশী ধনী রাষ্ট্র কাতারকে আশে পাশের কয়েকটি দেশকে দিয়ে একটি সর্বময় অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার কবলে ফেলেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই কুটনৈতিক দ্বন্দ্বের ক্রেডিট নিয়ে পরিস্থিতেকে ঘোলা করে তুলেছেন কাতার সহ অনেক দেশের জন্য। কাতারের নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে মাত্র ১২ হাজার, আর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক ঘাঁটি আছে সেখানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ১২ থেকে ১৫ হাজার সেনা সদস্য। কাতার যারপরনাই বিচলিত হয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই আরো ১২ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ বিমান কিনেছে।
কার সাথে যুদ্ধ করার জন্য কিনেছে তা অবশ্য পরিষ্কার নয়, তবে তারা এখন নানা দিক দিয়ে তাদের সামরিক সামর্থ বাড়াচ্ছে। এর আগের প্রসাশন গুলো সৌদি আরবের সাথে সুসম্পর্ক রাখলেও কাতারে তাদের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিল, অনেক বিষয়কে ছাড় দিয়ে হলেও মধ্যপ্রাচ্যে আই এস বিরোধী যুদ্ধে একজন শক্ত সহযোগী হিসেবে কাতারকে কখনই বিপদে ফেলে বাণিজ্য করেনি। সেই ধারা ভেঙ্গেছেন ট্রাম্প।
বাণিজ্য হয়েছে সৌদি আরবের সাথে, সেই বাণিজ্যের জোরে কাতারকে এক ঘরে করে দেয়ার পদক্ষেপে বাহবা নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, পরে আবার কাতারের কাছে অস্ত্র বিক্রয় করেছে। এই ঘটনায়, কাতার-তুরস্ক-ইরান-রাশিয়া একটি জোটে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ তৈরী হয়েছে, কেননা আগে থেকেই তুরস্ক-রাশিয়া-ইরান সিরিয়া প্রশ্নে একটি জোটের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ রেখেই। এখন, কাতারকে সাথে নিলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের একক প্রভাব বলয় বেশ ধাক্কা খাবে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
সৌদি সফরের পর, ইউরোপের নেতাদের সাথে বৈঠক করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশ, যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডার যৌথ সামরিক জোট ন্যাটোকে শক্তিশালী করার আগে, ন্যাটো পরিচালনায় পাওনা টাকা পরিশোধের ডাক দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ডাক পছন্দ হয়নি জার্মানী-ইংল্যান্ড- ফ্রান্স সহ প্রভাবশালী দেশগুলোর।
ট্রাম্পের সামনে প্রকাশ্যে ভুরু কুঁচকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন নেতারা। পরের সপ্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর জার্মানীর চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমেরিকার উপর নির্ভরশীলতা নয়, ইউরোপের নিরাপত্তা প্রশ্নে নিজেদের শক্তিশালী হতে হবে।’
অর্থাৎ ন্যাটো বেশ নড়বড়ে হয়েছে, অথবা ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের যে একক প্রভাব ছিল সেটা কমিয়ে দেয়ার পরিকল্পনায় আগাচ্ছে জার্মানী আর ফরাসি নতুন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো’র নেতৃত্ব। একদিকে ন্যাটোকে আঘাত করছেন তার প্রধান মুরুব্বি ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্যদিকে, যাকে প্রতিরোধ করার জন্যেই ন্যাটোর জন্ম সেই রাশিয়া বলকান অঞ্চলে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেই চলেছে।
ইউক্রেনের শহর ক্রিমিয়া এরই মধ্যে দখলে নিয়েছে রাশিয়া, সেখান থেকে এখন বলকান অনেক দেশের সীমান্ত বরাবর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। এই আচরণে ভয় পেয়ে নিশ্চয়ই ন্যাটো ভুক্ত দেশগুলো তাদের পাওনা পরিশোধ করে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলে আরো বেশ কিছু বিলিয়ন ডলার জমা দেবে।
এই জমা’র সাথে অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের দেশগুলির বিশ্বাসের জমাট আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর আগে ব্রেক্সিট ভোটের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সমর্থনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফরাসি নির্বাচনে কট্টর অভিবাসন বিরোধী ল্যুপেনকে সমর্থন দিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এসব আচরণে নিশ্চয়ই জার্মানী ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকাকে আগের মত নিরেট বন্ধু ভাবছে না।
এর বাইরে, মেক্সিকো, কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি রহিত করেছিলেন ট্রাম্প। সেটি নিয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অবিশ্বাসের বড় দেয়াল রচিত হয়েছে কানাডা আর মেক্সিকোর সাথে। অভিবাসী বিরোধী রাজনীতি আর মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে ইতিমধ্যে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়।
অর্থাৎ সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই প্রায় ছয় মাসের প্রেসিডেন্সিতে বিশ্ব ব্যবস্থা বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে। অথবা, আরো বড় ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে বেশ নিকট ভবিষ্যতেই। সেকারণেই আমেরিকার এতদিনের মোড়লিপনা আর বিশ্ব ব্যাবস্থা শাসন করার বিপরীতে বর্তমানের আমেরিকাকে অনেকই ট্রাম্পের আমেরিকা বা ট্রাম্পেরিকা বলতে শুরু করেছেন। যেই ট্রাম্পেরিকার ফসল হতে পারে বিশ্বায়ন শব্দের যুতসই বিকল্প ট্রাম্পায়ন। এই ট্রাম্পায়নে প্রচলিত বিশ্বব্যাবস্থার বড় ব্যবচ্ছেদ হতে চলেছে, যার প্রমাণ মিলতে খুব সহসাই।
কয়েক দশক ধরে বিশেষত দ্বিত্বীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে বিশ্বব্যাবস্থা গড়ে উঠেছে সেটা আমেরিকার প্রভাব বলয়ের মধ্যেই। বিশ্বকে নিজের আয়ত্বে রাখতে কোথাও উদার নীতি কোথাও কৌশল আবার কোথাও কোথাও্ আমেরিকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, ছাড় দিয়ে, অন্যদেরকে কিছুটা ভারসাম্যমূলক অর্থনীতির সুবিধা দিয়ে আমেরিকা এতদিন ধরে তার পররাষ্ট্রনীতি চালিয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ সেসব বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ কৌশলের একেকটি গুরুত্বপূর্ন উপাদান ছিল। নাফটার মত আঞ্চলিক ভিত্তিক নানা চুক্তিও ছিল সেসব কৌশলের অংশ। ন্যাটোর মত সামরিক জোট ছিল সেগুলির গুরুত্বপূর্ন অংশ। এই তত্ত্বের মুলকথা ছিল, বিশ্বকে একটি পরিবারের অর্ন্তভুক্ত করা। যেই পরিবারে কেউ দূর্বল থাকলে তাকে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে অপেক্ষাকৃত টিকিয়ে রেখে একটি পারিবারিক শক্তি জোরদার করা।
অবাধ বাণিজ্যের মাধ্যমে ক্ষুদ্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের কূটনীতির ফসল, যেটিকে এখন ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রই ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে। সেখানে, আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থকে একেবারে উলঙ্গ ভাবে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সেই বুঝে নেয়ার অংশ হিসেবেই দেশে দেশে, এলাকায় এলাকায় যে স্থিতিবস্থার নীতিতে চলছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেখান থেকে বেশ সরে আসতে শুরু করেছে। নিজেদের অর্থনৈতিক শ্লথ গতি বা দৈন্যদশার মুক্তি ঘটাতেই এইসব পদক্ষেপ। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও এতদিনের যে প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থা সেটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে আবার ৬০ এর দশকের কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে এসে ঠেকেছে। কিউবার সাথে সাম্প্রতিক সম্পর্ক ছিন্ন করনকে সেই কোল্ড ওয়ার যুগের আগমন বলেই বলছে স্থানীয় বিশ্লেষণগুলো।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই বলেছিলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চাই, সারা বিশ্বের প্রেসিডেন্ট হতে চাই না। দায়িত্ব নেবার পর বিশ্বের নানান দেশের উপর মোড়লিপনার কূট কৌশলগুলি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার নানা পদক্ষেপ যেমন তার সেই অঙ্গীকারের ফসল, তেমনি আমেরিকাকে আবার ষাটের দশকের রাজনীতিতে ফিরিয়ে নেয়াও সেই পদক্ষেপের ফসল। যেখানে দখলদারিত্ব, একক বাণিজ্য আর অভ্যন্তরীণ ভাবে সকল বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর সরলীকরণকে অস্বীকার করেই চালাতে চাইছেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে।
তিনি হয়তো ভেবেছেন বিশ্ব আসলেই আধমরা অবস্থায়। সেই আধমরা বিশ্বকে বড় বড় ঘা দিচ্ছেন। তাতে এই বিশ্বব্যাবস্থা জেগে উঠবে নাকি অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাবে সেটা সময় বলে দেবে। তবে আপাতত মনে হচ্ছে, আঞ্চলিক আর বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার গতি বাড়তে শুরু করেছে এসব পদক্ষেপে। বাকীটা সময়ের বিশ্লেষণেই বলা যাবে।
নিউইয়র্ক ২৪ জুন
সাহেদ আলম : সাংবাদিক।

]]>
আইন কি ধনী-গরিব বোঝে? https://sherakantha.com/2017/05/26/%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%97%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac-%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%9d%e0%a7%87/ Fri, 26 May 2017 17:00:16 +0000 http://sherakantha.com/?p=121961 Continue reading আইন কি ধনী-গরিব বোঝে? →]]> সারওয়ার-উল-ইসলাম:

আমাদের পুলিশ বাহিনী ইচ্ছে করলেই আসামিকে ধরতে পারে। এটা আমরা গর্ব করেই বলতে পারি। বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় একে একে পাঁচ আসামিকে তারা ধরতে পেরেছে। খুব অল্প সময়েই ধরা পড়েছে এই আসামিরা। এটার জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।

ধর্ষণের ঘটনাটি মিডিয়ায় যেভাবে প্রচার পেয়েছে, আর সমাজের নানা স্তরের মানুষ যেভাবে মতামত জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, সেটা অভাবনীয়। আমরা সমাজে ঘটে যাওয়া কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে চাই না, তা গত দুই সপ্তাহের মিডিয়া ঘাটলেই টের পাওয়া যাবে।

কে বাদ গিয়েছে? সাবেক আইনমন্ত্রী, কথাসাহিত্যিক, মানবাধিকারকর্মী,  জনপ্রতিনিধিসহ পুলিশের সাবেক আইজি। দোষীদের শাস্তি দাবি জানিয়ে তাঁরা সবাই পত্রিকায় পৃথক পৃথক মত দিয়েছেন, পাশাপাশি দোষীদের শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। এর বাইরেও সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন মানুষের প্রতিবাদ ছিল নানাভাবে।

এখন দেখা যাক, সেই অপরাধী ও তাদের দোসরদের কি শাস্তি হয়। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।

কিন্তু আমাদের কি মনে পড়ে সেই ছোট মেয়েটির কথা, তার বাবার কথা? গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা। গ্রামের নাম কর্ণপুর সিটপাড়া। এ গ্রামের হজরত আলী তাঁর আট বছরের পালিত মেয়ে আয়েশা আক্তারকে নিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন ২৯ এপ্রিল। বখাটে কর্তৃক মেয়ের শ্লীলতাহানি ও প্রতিবেশীদের হামলার হুমকির বিচার না পেয়েই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন হজরত আলী।

সেই ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ এখনো ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বরং এখনো হামলার আশঙ্কায় হজরত আলীর বাড়িতে দিনরাত পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। আসামিরা প্রভাবশালী বলেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাধারণভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, তা হলে কি এ মামলার ঘটনায় আসামি ধরার ব্যাপারে পুলিশের আন্তরিকতার ঘাটতি আছে?

নাকি এই যুগল আত্মহত্যার ঘটনায় দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়নি বা দেশের সুশীলসমাজ প্রতিবাদ জানায়নি বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতটা তৎপরতা দেখাচ্ছে না? নাকি নিতান্তই অসহায় আর গরিব মানুষ বলে কোনোমতে চলছে আইনের চাকা।

আমরা তো সেই অমোঘবাণী ছোট থেকেই শুনে আসছি- আইনের চোখে সবাই সমান। ধনী-গরিব সবার জন্যই আইন সমান। তা হলে কেন এই যুগল আত্মহত্যার ঘটনাটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

আমরা অবশ্যই স্বীকার করি বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাটি আমাদের কাছে মর্মস্পর্শী। কারণ এভাবে আরো কত তরুণীকে ওই সাফাত আর বন্ধু নাইম আশরাফরা নষ্ট করেছে আমরা হয়তো জানি না। হয়তো সেই তরুণীদের লোকলজ্জার ভয়ে সেগুলো আমাদের কাছে অজানাই থেকে যাবে। তাই এই অপরাধীদের দ্রুত বিচার হওয়া ছাড়া কোনো সহজ সরল পথ নেই। যেন অন্য ধনীর দুলালরা বুঝতে পারে অপরাধ করলে বাবার টাকা থাকলেও রক্ষা পাওয়া যাবে না। আইনের চাকা ধনী-গরিব বোঝে না। শাস্তি পেতেই হবে।

প্রসঙ্গে ফিরে আসি, পুলিশ বাহিনী চাইলেই সব পারে, এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

আমরা পত্রিকায় দেখেছি, খুনের আসামি জেলখানায় না থেকে আরাম আয়েশে দিন গুজরান করছে বারডেম হাসপাতালে। খুনের মামলার আরেক আসামি টাঙ্গাইলের এক সাংসদ হাসপাতালে ছিলেন। ৭৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ইয়াবা ব্যবসায়ী জেলখানায় না থেকে ১৮ মাস ধরে বারডেমে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। এমনও শোনা গেছে, সে নাকি বাইরেও ঘুরে আবার হাসপাতালে এসেছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কারা কর্তৃপক্ষ আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। পরে তাদের আবার কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়েছে।

এসব ঘটনা শুনে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী ধারণা জন্ম নেয় আইনের প্রতি?

তবে আমরা এখনো আশা করি, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমাদের পুলিশ বাহিনী যদি মনে করে আসামি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করবই, তা হলে তারা তা পারে। তাদের কাছে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য এক আইন।

হজরত আলীর মেয়েশিশুকে নিয়ে আত্মহত্যার পেছনে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের অতিসত্বর ধরে আইনের আওতায় আনা হবে। বনানীর ধর্ষণ ঘটনার আসামিদের পেছনে প্রভাবশালীদের চেয়ে তারা যত বড়ই হোক না কেন, তারা ধরা পড়বেই।

এই আশা আমরা করতে পারি।

লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

]]>
আমরা পুরুষ, ধর্ষক নই https://sherakantha.com/2017/05/26/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b7-%e0%a6%a7%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%95-%e0%a6%a8%e0%a6%87/ Fri, 26 May 2017 16:55:07 +0000 http://sherakantha.com/?p=121955 Continue reading আমরা পুরুষ, ধর্ষক নই →]]> জব্বার হোসেন :পুরুষ খারাপ, পুরুষ খারাপ, পুরুষ খারাপ, পুরুষ লম্পট, পুরুষ লম্পট, পুরুষ লম্পট, পুরুষ ধর্ষক, পুরুষ ধর্ষক, পুরুষ ধর্ষক- মনে হয় জগতের সকল পুরুষই খারাপ, লম্পট, ধর্ষক। নষ্ট, বদমাস, দুঃশ্চরিত্র- সকল পুরুষ। আদতে তো তা নয়। হতেও পারে না কখনও। জগতের সকল মানুষ যেমন পারে না একই রকম হতে, তেমনি  সকল পুরুষও পারে না শুধু ভালো বা মন্দ হতে। প্রত্যেকেই যে যার মত। ভালো-মন্দ ব্যক্তি, ব্যক্তি চরিত্রের উপর নির্ভরশীল। তাই একজন পুরুষ হিসেবে, পুরুষের প্রতি এই মনোভঙ্গির তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অস্বীকার করছি। অসম্মতি প্রকাশ করছি এমন মন্তব্যের। শুধু তাই নয়, অন্য সকল পুরুষদেরও আমার মত প্রতিবাদ করা উচিত বলেই মনে করি আমি।

বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা পরপর ঘটেছে এখানে। এখনও ঘটছে।  একের পর এক ধর্ষণ ঘটছেই। মনে হয় ধর্ষণের এক অবাধ ভূমিতে পরিণত হয়েছে এদেশ। আজ হোটেলে তো কাল স্টেশনে। সকালে ভেড়ামারা, বিকালে ঠাকুরগাঁও। সন্ধ্যায় ফরিদপুর তো মধ্যরাতে চাঁদপুর। কোন বয়স নেই, কিশোরী-তরুণী-যুবতী-প্রৌঢ়া-বৃদ্ধা- নিস্তার নেই কারো, ধর্ষণের হাত থেকে। এমন এক অসভ্য সময় ও পরিস্থিতি পার করছি আমরা। সম্ভবত এমন কোন নারী নেই বাংলাদেশে, যে ভেতরে ভেতরে ভীত সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত নয় ধর্ষণের ভয়ে।
যত অসভ্য পরিস্থিতিই হোক, যত বীভৎস ধর্ষণ দৃশ্যই ভেসে উঠুক চোখের সামনে, সকল পুরুষকে দায়ী করা যাবে, নাকি উচিত হবে ধর্ষক বলা? তবে কেন সকল পুরুষদের ধর্ষক বলছি, দায়ী করছি?

কদিন ধরে দেখছি এখানে সেখানে ধর্ষণ নিয়ে বিক্ষিপ্ত মতামত, মুক্তমত প্রকাশিত হচ্ছে বেশ। ধর্ষণ নিয়ে লোকে বেশ সবর। নারীদের লেখায় ঘুরে ফিরে একই কথা, একই মন্তব্য। পুরুষ মানেই খারাপ। পুরুষ মানেই ধর্ষক। পুরুষের হাত থেকে বেঁচে থাকো। নিরাপদ থাকো। না হয় তোমাকে ধর্ষণ করবে পুরুষ। খুবই ভুল তথ্য, তত্ত্ব- হেইট স্পিচ।

ঘৃণা বাক্য ছড়িয়ে লাভ নেই। মনে রাখতে হবে এই পুরুষই কিন্তু আমার বাবা, আমার ভাই, আমার স্বামী, আমার সন্তান। নারী ও পুরুষ কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। প্রতিযোগী নয়। একের বিরুদ্ধে অন্যকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে লাভ কী? কেন দাঁড় করাচ্ছি একের বিরুদ্ধে অন্যকে। শত্রু ভাবাপন্ন সম্পর্ক পুরুষ-নারীতে এমন তো নয়।

আমরা পুরুষ, ধর্ষক নই। তাই ‘পুরুষ ধর্ষক’  যখন ঢালাওভাবে বলা হয় তাতে আমার প্রবল আপত্তি। জগতের সকল পুরুষকে কেন আমরা ধর্ষক বানিয়ে দিচ্ছি। ধর্ষক, ধর্ষকই। অপরাধ, অপরাধই। অপরাধীকে দেখতে হবে অপরাধী ব্যক্তি হিসেবেই। সকল পুরুষতো আর ধর্ষণ করে না, যৌন হেনস্তা করে না, নির্যাতন করে না, নিপীড়ন করে না, আগুনে পোড়ায় না, পাথর ছুঁড়ে না- তাহলে সবাইকে কেন এক করে ফেলছি? আর সত্যিকারের পুরুষ কখনোই ধর্ষণ করে না, করতে পারে না। অসম্ভব। যে ধর্ষক সে কাপুরুষ।
পুরুষ ধর্ষক, তাই শাস্তি হিসেবে তার পুরুষাঙ্গটি কেটে ফেল, তাকে মৃত্যুদণ্ড দাও- এমন অযৌক্তিক সমাধান বাক্য ছুঁড়ছেন অনেকেই। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষকের এমন শাস্তি দাবি করে তোলপাড়। যে কোন মূল্যে তার ‘অঙ্গ’টি কেটে নিতে সরব অনেকেই। কিন্তু এতে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না আমার। কখনও মনেও হয়নি। খুব হটকারী ও হুজুগে আমরা। যুক্তির চেয়ে আমাদের আবেগ বেশি। ধর্ষণের জন্য পুরুষের এত ছোট দু’তিন ইঞ্চি অঙ্গটিকে দায়ী করে লাভ কী? পুরুষাঙ্গ মোটেও ধর্ষণ করে না। যদি তাই হতো তবে তো সকল পুরুষেরই এই অঙ্গ রয়েছে।

সকল পুরুষ কি ধর্ষণ করে, তা তো নয়। ধর্ষণ আসলে ‘অঙ্গ’ করে না, করে ‘মস্তিষ্ক’, ‘মানসিকতা’, ‘পুরুষতান্ত্রিকতা’। যে মানসিকতার কারণে পুরুষ ধর্ষণ করে সেটিকেই চিহ্নিত করা জরুরি। সেটিকেই দায়ী করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বুঝতে হবে, ধর্ষকের মনোজগত, মানসিকতা আর সকল পুরুষের মানসিকতার চেয়ে আলাদা। এটি মানসিকতার একটি বিশেষ অবস্থা বা দশা। এই অবস্থাটি খুব স্বাভাবিক নয়, বিকৃত। ধর্ষকের ভালো লাগে ‘সেক্স’ নয়, ‘ভ্যায়োলেন্স’। চরম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, ক্ষোভ, ক্রোধ, নারীর প্রতি বিরুপ, পঙ্কিল মনোবৃত্তিই ক্রিয়াশীল থাকে। ‘পুরুষাঙ্গ’ অবলম্বন মাত্র।

চারপাশ থেকে মানুষ শেখে। শৈশব, বয়ঃসন্ধি আর বেড়ে ওঠার সময়টা তার বাকি জীবনকে প্রভাবিত করে প্রবলভাবে। এ সময়ের আলোচিত ধর্ষক, সাফাতের মানসিকতা বোঝা যায় তার বাবার অশ্লীল মন্তব্যে। ‘গুড পেরেন্টিং’ বলে কিছু ছিল না সেখানে। তার বাবাও নারীদের ‘যৌনদ্রব্য’  হিসেবেই বিবেচনা করেছে, দেখে দেখে ছেলেও দীক্ষা নিয়েছে বাবার মন্ত্রে। ঘরে স্ত্রীরা দাসী বাদী, যৌনবস্তু, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। তাদের মতামতের মূল্য নেই। গার্হস্থ্য বাদীগিরি, যৌনদাস বৃত্তিই তাদের নিয়তি। সন্তানরা এই দেখে দেখে বড় হয়। নারী মাত্রই স্তন আর যোনির মাংসপিণ্ড, মানুষ ভাবে না সে। ফলে বস্তু, পণ্য, দ্রব্যের মতো আচরণ করে তার সঙ্গে। মানসিকতার বদল না ঘটলে, দৃষ্টিভঙ্গি না পাল্টালে শুধু আইন দিয়ে লাভ হবে না কোনও। আইনতো ছিল তখনও, আছে এখনও।

পুরুষতান্ত্রিকতার যে বিশাল জাল তা ছিড়ে ফুড়ে নারী নয় কেবল, পুরুষও বেরিয়ে আসতে চায়। বেরুতে না পারলে মুক্তি নেই কারো, না পুরুষ, না নারীর। নারীর সঙ্গে পুরুষ যেমন নানা সম্পর্কে জড়িয়ে আছে, তেমনি পুরুষও আছে জড়িয়ে, নারী পুরুষের নানা সম্পর্কে। নারীর যে অধিকার আন্দোলন, মুক্তি আন্দোলন তাতে পুরুষ কোনও না কোনওভাবে ভূমিকা রেখেছে সবসময়। ঐতিহাসিকভাবে এ কথা সত্য। এই উপমহাদেশে সতীদাহ প্রথার মতো বীভৎসতার বিরুদ্ধে পুরুষই দাঁড়িয়েছে। সহমরণের প্রতিবাদ করেছে। বিধবা বিবাহের আন্দোলন সেও তো পুরুষেরই ফসল। বিদ্যাসাগর আর রাজা রামমোহন রায়কে এই ভারতীয় উপমহাদেশ ভুলতে পারবে কোনও কালে? নারীদের পাশে তো পুরুষই দাঁড়িয়েছে।

আমি পুরুষ। আমি মানুষ। সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ। অমানুষ নই, ধর্ষক নই। ধর্ষণ অসুস্থতা, ধর্ষক অসুস্থ, যৌন বিকারগ্রস্থ। আমি মানবিক, আমি প্রেমিক। ধর্ষণ নারীর জন্য যতটা না লজ্জার, তার চেয়ে শত সহস্র গুণ লজ্জার পুরুষের। এতে পুরুষের সম্মানই নষ্ট নয়। সম্ভ্রমবোধে আঘাত লাগে। তাই ধর্ষণে সত্যিকারের পুরুষদেরই প্রতিবাদ করা উচিত বেশি, পুরুষ হিসেবে আমার তাই মনে হয়।

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।
[email protected]

]]>