শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইসলামে সৌন্দর্য ও রুচিবোধ

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১
news-image

মানুষের আচার-আচরণ, জীবনধারণের বৈচিত্র্য, অভ্যাসের ভিন্নতা ও খাবার-দাবারসহ সবকিছুকে সামনে রেখে ইসলাম ব্যক্তিজীবনের বাহ্যিক, অভ্যন্তরীণ সব ধরনের সৌন্দর্য ও রুচিবোধের বৈশিষ্ট্যাবলি অর্জনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে। কারণ মানুষের অন্তর ও দৃষ্টিভঙ্গি যদি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল না হয় তাহলে তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মূল্যহীন। সুন্দর দেহাবয়বের অধিকারী নিচু মানসিকতা, কর্কশ কথাবার্তা, মন্দ আচরণ, নোংরা পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাবার গ্রহণে অভদ্রতা ইত্যাদির কারণে সমাজে চলাচলের অনুপযুক্ত হতে পারেন। আবার দেখতে কদাকার হলেও সুন্দর-শালীন ব্যবহার, চমৎকার চলন-বলন ও উত্তম আচরণের দরুন তিনি রুচিশীল সামাজিক মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতে পারেন।

ইসলাম ব্যক্তির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জীবনে সৌন্দর্য অর্জন, সুরুচির অনুশীলন ও সর্বাবস্থায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর অটল থাকার ব্যাপারে জোর তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআন-হাদিসে এ সম্পর্কে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও সময়োপযোগী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ সুরা বাকারা : ২২২

ইসলাম তার অনুসারীদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে সৌন্দর্যম-িত করে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবনে অভ্যস্ত করতে চায়। বর্ণিত আয়াত দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, তওবা মানুষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বাড়ায়, যেমন পবিত্রতা বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। পবিত্র কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো।’ সুরা মুদ্দাসসির : ৪

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, তোমাদের দেহের যে অংশ প্রকাশ করা দোষণীয় তা ঢাকার জন্য এবং তা সৌন্দর্যেরও উপকরণ। বস্তুত তাকওয়ার যে পোশাক সেটাই সর্বোত্তম। এসব আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।’ সুরা আরাফ : ২৬

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।’ মুসলিম শরিফ : ৯১ইসলামি শরিয়তে নারী-পুরুষের পোশাক-পরিচ্ছদের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে। তবে পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে আভিজাত্য প্রকাশের নামে অশ্লীলতা, অপচয় ও অহংকারকে ইসলাম হারাম তথা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়াও কোনো মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও ইসলামের নির্দেশনাগুলো প্রমাণ করে, ইসলাম তার অনুসারীকে কতটা সৌন্দর্যবান ও রুচিশীল হিসেবে দেখতে চায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘স্বভাবজাত বিষয় ৫টি। খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, গোঁফ খাটো করা, নখ কাটা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা।’ সহিহ্ বোখারি : ৫৮৯১

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ১০টি বিষয় স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। গোঁফ খাটো করা, দাঁড়ি লম্বা করা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, অঙ্গের গিরাসমূহ ঘষে-মেজে ধৌত করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, মলমূত্র ত্যাগের পর পানি ব্যবহার করা। বর্ণনাকারী জাকারিয়া বলেন, (আরেক বর্ণনাকারী) মাসআব বলেছেন, আমি দশ নম্বরটি ভুলে গেছি। সম্ভবত : তা হলো কুলি করা।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৬১

বর্ণিত হাদিস দুটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে দশটি বিষয় উল্লেখ রয়েছে তা ব্যক্তির জন্য সৌন্দর্য ও রুচিবোধের অন্যতম নিয়ামক। উপরোক্ত বিষয়াবলি ছাড়াও মানুষের চালচলন এবং কথাবার্তায় তার সৌন্দর্য ও রুচিবোধ ফুটে ওঠে। তাই দ্রুতবেগে হাঁটা, ইচ্ছা করে খুব হেলেদুলে কিংবা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা সুরুচিকর কোনো বিষয় নয় বরং দৃষ্টিকটু আচরণ। তদ্রƒপ অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত জামাকাপড় নাড়াচাড়া, চলাফেরার সময় এদিক-ওদিক তাকানো, অপ্রয়োজনে কথা বলা, নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে বোঝাতে সব বিষয়ে মতামত দেওয়া, ভাষার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, ধূমপান, পানের পিক, থুথু ও কফ যেখানে-সেখানে ফেলা, কথায় কথায় রাগ করা, অযথা ভর্ৎসনা করা, মানুষের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করা, অশ্লীল গালমন্দ ইত্যাদি মন্দ কাজ পরিহার করা। অন্যভাবে বললে, যাবতীয় দৃষ্টিকটু, শ্রুতিকটু, অসুন্দর ও অরুচিকর কাজের বিষয়ে ইসলাম সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ, সেই প্রকৃত মুসলিম। আর যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে, সেই প্রকৃত হিজরতকারী।’ সহিহ্ বোখারি ও মুসলিমঅন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সেই প্রকৃত মুমিন।’ মিশকাতুল মাসাবিহ : ৩৩

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, মেহমান সম্মান করে এবং কথা বলার সময় উত্তম কথা বলে অথবা চুপ করে থাকে।’ সহিহ্ বোখারি : ৬০১৮

অশ্লীল ও কটুবাক্য, মিথ্যা অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত কথা যারা বলে তাদের অধিকাংশের মধ্যে মুনাফেকির আলামত বিদ্যমান। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুনাফিক চেনার লক্ষণ হলো চারটি। সেগুলো হলো ক. যে কথায় কথায় মিথ্যা কথা বলে, খ. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, গ. তার কাছে কোনো জিনিস আমানত রাখলে খেয়ানত করে এবং ঘ. ঝগড়া-বিবাদে অশ্লীল গালিগালাজপূর্ণ শব্দ বলে।’ সহিহ্ বোখারি : ৩৪