শুক্রবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৯ ইং

ফাঁকা ঢাকা নিয়ে শঙ্কিত চিকিৎসকরাও

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী‘রাস্তা ফাঁকা পেলে মাথা ঠিক থাকে না। এমনিতেই মোটরসাইকেল বেশি গতিতে চালানোর অভ্যাস আমার। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় তো সেটা সারাবছর সম্ভব হয় না। তাই আমরা অপেক্ষা করে থাকি দুই ঈদে ঢাকা ফাঁকা হওয়ার জন্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাস্তাও ফাঁকা পেলাম। কিন্তু দুর্ঘটনাটা আর এড়াতে পারলাম না।’ কথাগুলো বলছিলেন ২১ বছরের আলভী। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) বেডে শুয়ে থাকা আলভী বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বন্ধুদের নিয়ে রেস করার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটে যায় চোখের পলকেই। রেললাইনের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যালান্স রাখতে পারিনি, পড়ে যাই। তারপর এখানে।’

বৃহস্পতিবার (২৯ জুন) পঙ্গু হাসপাতাল গিয়ে দেখা যায়, ঈদের ছুটির সময়ে হাসপাতালে আসা প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন। এর বড় একটি অংশই সিএনজি ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। চিকিৎসকরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে ঢাকার রাস্তা ফাঁকা থাকার কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারা বিশেষ করে উল্লেখ করলেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কথা। তারা বলেন, মোটরবাইক চালানো তরুণদের মানসিকতা বদলাতে হবে। অ্যাডভেঞ্চারের মোহে পড়ে তারা এভাবে নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পঙ্গু হাসপাতালের রেজিস্ট্রার বুক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জুন থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন ৬৭১ জন, এর মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলভী আহত হওয়ার পর বুঝতে পারছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো ঠিক না। তিনি বলেন, ‘জোর বাঁচা বেঁচে গেছি। শিক্ষা হয়ে গেছে। সেই শিক্ষা থেকে সবাইকে বলতে চাই, এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ রাস্তায় রেসে নামবেন না। দুর্ঘটনায় পড়ে মরে গেলে তো ভালো। কিন্তু বেঁচে থাকলে যে ভোগান্তি, সেই কষ্ট কাউকে বোঝানো যাবে না।’

আলভীর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে দেখা গেল ১৯ বছরের রাজীবকে। তার ভাই মিলন দৌড়াচ্ছিলেন রক্তের প্রয়োজনে। মিলন বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল ৯টায় চিটাগাং রোডে দুর্ঘটনা ঘটে। সিএনজিতে করে আমরা দু’জন যাচ্ছিলাম বারুদি আশ্রমে পূজা দিতে। তখনই বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা আরেক সিএনজির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আমার তেমন কিছু না হলেও গুরুতর আহত হয়েছে রাজীব।’

আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রাজীবপঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত স্টাফ নার্স পারুল মণ্ডল বলেন, ‘১৪ বছরের চাকরি জীবনের ১০ বছর কাটছে এই পঙ্গু হাসপাতালে। এই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দুই ঈদের সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বছরের অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি।’
পারুল বলেন, ‘‘রাস্তা ফাঁকা থাকায় তরুণদের মাথা ঠিক থাকে না। এদের সঙ্গে সিএনজি ও বাস ড্রাইভাররাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবার ড্রাইভারদের বলেও লাভ হয় না। কিছু বললে বলে, ‘আপনাদের চেয়ে কি আমাদের জীবনের মায়া কম নাকি? আমার কাজ আমারে করতে দেন, বসে থাকেন চুপচাপ।’’
গত মঙ্গলবার (২৭ জুন) রাতে পঙ্গু হাসপাতালে ৩৩ জন রোগীর অপারেশন হয়েছে জানিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শুভ প্রসাদ বলেন, ‘ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে ঈদের ছুটির সময়ে প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটে। গত কয়েকদিনে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশিরভাগই এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার। এর মধ্যে আবার বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে মোটরসাইকেল বা সিএনজিতে।’ ফাঁকা রাস্তায় যেকোনও ধরনের যান চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেই মনে করেন এই শুভ প্রসাদ।

ফাঁকা রাস্তায় অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালানোকে ‘রেকলেস অ্যাটিচিউড’ বা ‘বেপরোয়া মনোভাব’ অভিহিত করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের এই সময়টাতে ঢাকার রাস্তা ফাঁকা পেয়ে তরুণদের অনেকেই অ্যাডভেঞ্চারে মেতে ওঠে। তাদের এই বেপরোয়া মনোভাব মস্তিষ্কে উদ্দীপনা তৈরি করে। তখন তাদের মনে হয়, পারলে আকাশ দিয়ে গাড়ি চালাবে। এসময় তাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
এমন মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া উচিত বলে মনে করের তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এমন অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে তাজা প্রাণ হারিয়ে যায়। আর যারা বেঁচে থাকে, পরিবারসহ তাদের পোহাতে হয় অশেষ দুর্ভোগ। তাই ঢাকার ফাঁকা রাস্তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ছুটির সময়গুলো নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনাই করা উচিত প্রশাসনের।’

এ জাতীয় আরও খবর