শুক্রবার, ২৩শে আগস্ট, ২০১৯ ইং

ক’জন দেখেন ঈদের নাটক?

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

সারওয়ার-উল-ইসলাম : এবার ঈদের আগের দিন অর্থাৎ ২৫ জুন রাত সাড়ে ন’টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন হ‌ুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘একদিন হঠাৎ’ পুনঃপ্রচার করে। নাটকটি এতটাই জনপ্রিয় যে, কতবার প্রচারিত হয়েছে বিটিভি কর্তৃপক্ষের হিসেবে আছে কিনা সন্দেহ। এ রকম হাসির নাটকের সংখ্যা কমই আছে। নেই সংলাপে ‘ছ্যাবলামি’ আর অতিকথন। সাবলিলভাবেও যে হাসির ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘একদিন হঠাৎ’ নাটকটি।

আমার দুই মেয়ে বাংলাদেশের নাটক খুব একটা দেখে না। এর জন্য বকাঝকাও কম করি না। ঈদের হাসির নাটক দেখে হাসতে পারে না ওরা, জোর করে হাসানোর জন্য পরিচালকসহ অন্যদের নানা রকম কটু কথাও বলে। এবার ‘একদিন হঠাৎ’ নাটক প্রচারের সঙ্গে-সঙ্গে দু’জনকে ডেকে পাশে বসালাম। প্রথমটায় খুব বিরক্ত দু’জন, কেন বসালাম। তারপরে আবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক! পরে নাটকের ভেতরের কিছু ঘটনা আগেই বলে দেওয়ায় অনিচ্ছা থাকার পরও বসে পড়লো। আস্তে আস্তে দেখলাম ওরা বেশ মজা পেয়ে যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হাসির ঝিলিক দেখে বাবা হিসেবে এই প্রথম ব্যর্থ হইনি ভাব করে ভারিক্কি চালে বললাম, সামনে দেখবি হুমায়ুন ফরিদী আরও কী কী করে।
পরের ঘটনা হচ্ছে, নাটক শেষ না করে কন্যাদ্বয় টেলিভিশনের সামনে থেকে ওঠেনি।
এ গল্পটি শোনানোর কারণ এ জন্য যে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঈদে কোনও চ্যানেলের নাটক দেখে খুব একটা আনন্দ পাওয়ার কথা শুনি না। হয় সংলাপে ছ্যাবলামি, দৃশ্যায়নে সমস্যা, অতিঅভিনয়ে জর্জরিত আর কাহিনিতে ধারাবাহিকতার অভাব। কোনও রকমে গোঁজামিল দিয়ে শেষ করা।

বিষয় হচ্ছে, কেন বর্তমানে আমাদের ঈদের নাটক টানতে পারছে না দর্শকদের? শুধু ঈদের নাটকই বা কেন বলি, সাধারণ সময়েও নাটক টানতে পারছে না। তাই টিভি রিমোট ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের চ্যানেলে।
এ প্রসঙ্গে অনেক রকম কথা শোনা যায়। আমাদের নাটক এখন আর পরিচালকদের হাতে নেই। সেটা চলে গেছে এজেন্সির হাতে। নাট্যকার বা লেখকেরাও অসহায়। তারা যে কাহিনি বা চিত্রনাট্য করে দিচ্ছেন, তা আমূল পাল্টে ফেলছে এজেন্সির লোকজন। এই যদি হয় নাটক তৈরির অবস্থা তা হলে তো কিছুই বলার নেই।

একসময় বিষয়টা ছিল এরকম, নাট্যকার নাটক লিখবেন। নাট্যকার দেখাবেন পরিচালককে। পরিচালকের গল্প পছন্দ হলে সেটা বানানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। পরিচালক বানানোর পর চ্যানেলে জমা দেবেন। চ্যানেলের প্রিভিউ কমিটি সেটা দেখার পর নির্বাচন করবে। ভালো হলে প্রচারিত হবে। কখনও সামান্য কারেকশনের প্রয়োজন হলে পরিচালককে বলে কারেকশন করে নাটকটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন বেশির ভাগ চ্যানেলেই নাকি নেই। তবে দুই/একটি চ্যানেল এখনও সেই মহৎ ও স্বচ্ছতার বিষয়টি ধরে রেখেছে। তাদের সাধুবাদ দিতেই হয়। তাদের জন্যই এখনও এই আকালের সময় দুই/একটি ভালো টেলিফিল্ম বা নাটক কিছু রুচিশীল দর্শককে ধরে রাখতে পেরেছে।

তবে এক্ষেত্রেও একটি সীমাবদ্ধতার কথা শোনা যায়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটকের বা টেলিফিল্মের বাজেটটি নির্ধারণ করে দেন। এক ঘণ্টার নাটকের জন্য বলা হয় এক লাখ ষাট থেকে আশি হাজারের মধ্যে বানাতে হবে। তা হলে কী দাঁড়ালো? গল্পের ডিমান্ড অনুযায়ী কি নাটক বাবানো সম্ভব? চরিত্র কমাতে হবে। লোকেশন পরিবর্তন করতে হবে। আউটডোরে একেবারে না যেতে পারলেই পরিচালক বেঁচে যাবে। এর মানে হচ্ছে পরিচালককে হাত পা ধরে নদীতে ফেলা আর কী। তারপর সাঁতরে তীরে ওঠে আসতে হবে। যদি জীবনে টিকে থাকতে চাও।

এখন যে পদ্ধতিতে নাটক কেনাবেচা হয় সেটা আলুপটল কেনাবেচার চেয়েও খারাপ। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের নাকি কিছু করার নেই। হতাশ হতে হয় কথাটা শুনলে।
এখন ঈদের নাটক কেনাবেচা হয় এজেন্সির মাধ্যমে। একেকটা এজেন্সি মানে নাটকের আড়ত। তারা চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে চ্যানেলের সময় কিনে নেয়। সেই সময়টায় ইচ্ছে করলেই চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের পছন্দের নাটক চালাতে পারবে না। কারণ তারা অগ্রিম স্টেশনের সময় বিক্রি করে দিয়েছে। বিনিময়ে তারা তাদের সময়ের মূল্য পেয়ে যাবে। কখনও অগ্রিমও পেয়ে যায়।
যেমন ধরা যাক, রজনীগন্ধা নামে একটি এজেন্সি এবার ঈদে দশটি চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলে ঈদের সাতদিনের নাটক চালানোর সময় কিনে নিয়েছে। দামদস্তুর করে টাকার হিসেবটাও চ্যানেলের সঙ্গে ঠিক করে ফেলেছে। এখন তারা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে। কখনও নাট্যকাররা সেই এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে তাদের গল্প জমা দেয়। গল্প ভালো লাগলে টাকা দিয়ে কিনে নেয় এজেন্সি। না ভালো লাগলে অর্থাৎ তারা যেই মানের নাটক চায়, হাস্যরস সুড়সুড়ি, কাতুকুতু মার্কা গল্প হলে ভালো, না হলে নাট্যকারকে বলে সেই ধরনের গল্প নতুন করে লিখিয়ে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক বানানো শুরু করেন। এভাবে একেকটা এজেন্সি দুই থেকে তিন শ নাটক বানানোর কাজে নেমে পড়ে প্রতি ঈদে। এবার বিজ্ঞাপন পাওয়ার বিষয়। বিজ্ঞাপনদাতাদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ থাকে এসব এজেন্সির। দেখা যায় চ্যানেলের এক খণ্ড নাটক প্রচারের সময়ের দাম ঈদের কারণে চার লাখ টাকা। এজেন্সি সেই নাটকের ফাঁকে ফাঁকে যে বিজ্ঞাপন ঢোকায় তার মূল্য সাত থেকে আট লাখ টাকা। এক নাটকেই থাকছে তিন থেকে চার লাখ টাকা। এর মধ্যে এক নাটকে নাট্যকার-পরিচালক-শিল্পীসহ প্রোডাকশন খরচ বাবদ দেড় থেকে দুই/লাখ টাকা বাদ। তারপর লাভ থাকছে এক নাটকে কম করে হলেও এক লাখ টাকা।

দর্শক দেখুক আর না দেখুক নাটকগুলো ঈদে বিভিন্ন চ্যানেল প্রচার করছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে চ্যানেলগুলোর ধর্ণা দিতে হচ্ছে না। তারা তাদের টাকা পেয়ে যাচ্ছে। আর এজেন্সি কামাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
একটা সময় ছিল চ্যানেল কর্তৃপক্ষ পরিচালকের কাছ থেকে নাটক কিনত। তারপর এজেন্সির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতো। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থা কমিশনের মাধ্যমে চ্যানেলকে বিজ্ঞাপন দিত তখন। নাটকটি পরিচালকের কাছ থেকে কিনত দুই লাখ টাকা দিয়ে। আর নাটকের ফাঁকে ফাঁকে চ্যানেল বিজ্ঞাপন ঢোকাতো নাটকের মূল্যের তিন থেকে চার গুণ। এভাবে তারা ভালো মানের নাটক পেত। লাভটাও হতো বেশি। আর এখন টাকা চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছে। নাটকের মান বলে কিছু থাকছে না।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে কেন এজেন্সির প্রয়োজন? আর এইসব এজেন্সির লোকজনই বা কারা? তারা কি নাটক বোঝে? নাকি ইয়াং জেনারেশনকে শেষ করার জন্য আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য শিল্প-সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার জন্য ইয়ো ইয়ো কালচার তৈরিতে ব্যস্ত তারা। ইয়ার্কি আর ফাজলামি মার্কা সংলাপ দিয়ে নাটক তৈরি করাই কি তাদের লক্ষ্য? নাটক কেন ভালো লাগে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে? তাদের জীবনের কথা, পারিবরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নাটকগুলো কেন আমাদের মা বাবা বোন ভাবি খালা চাচিদের আজো আলোড়িত করে, সেগুলো কি ওইসব এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগীরা বোঝেন?
আসলে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের বেশির ভাগ চ্যানেলের কর্তা ব্যক্তিরা চান না দর্শকদের মন বুঝে নাটক নির্মিত হোক। যে নাটক দেখেই চুপ করে বসে পড়বে দর্শক। সংলাপ বা কাহিনির মোচড় তাদের নাটক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শককে বসিয়ে রাখবে টেলিভিশনের সামনে। তারা চান তাদের সময়ের দাম। দর্শকের মনের দামকে তারা থোরাই কেয়ার করেন।
দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেশে এসেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মমতাজ উদ্দিন আহমদ। ক’দিন আগে একটি বেসরকারি চ্যনেলের বিশেষ সম্পাদকীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান নাটক নিয়ে বলেছেন, ইয়ার্কি আর ফাজলামি হচ্ছে।
খুবই চিন্তার বিষয়, এই জন্য যে তার মতো স্বনামধন্য একজন মানুষ যখন এরকম অনুভব করেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না, কী হচ্ছে আমাদের চ্যানেলগুলোতে নাটকের নামে।

আমরা দোষ দেই আমাদের নতুন প্রজন্মকে। তারা দেশি চ্যানেল দেখে না। দেশি নাটক দেখে না। কিন্তু সত্যি কী তাদের ওপর এই দোষের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায়? তাই যদি হয় তবে কেন আমার কলেজ পড়ুয়া আর ইস্কুল পড়ুয়া মেয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‘একদিন হঠাৎ’ দেখতে বসে না শেষ হওয়া পর্যন্ত বসেছিল?
তবে এবার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ‘ছবিয়াল ঈদ রি-ইউনিয়ন’ আর অমিতাভ রেজা চৌধুরী ‘আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ’ নামে নাটকের দু’টি ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের সাধুবাদ।
আমাদের চ্যানেল মালিকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা এখনও পারেন একটু চেষ্টা করলে ভালো নাটক নির্মাণ করতে। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা। সপ্তাহে না হোক মাসে একটা নাটক তৈরি করা শুরু করেন। দেখবেন আস্তে আস্তে দর্শক ফিরবেই বাংলাদেশের চ্যানেলে।
লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

এ জাতীয় আরও খবর