বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং

‘আগের চেয়ে ভালো’

সেরাকণ্ঠ ডট কম :
জুলাই ২, ২০১৭
news-image

গোলাম মোর্তোজা : ‘অমুক আমল ভালো ছিল’- ছোট বেলায় শুনেছি, নিশ্চয় অনেকেই শুনেছেন। যিনি বলেন তার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। যাবতীয় সংকট, দুঃখ- কষ্ট যেহেতু বর্তমান সময়েই মুখোমুখি হতে হয়, ফলে মানুষ ভাবতে ভালোবাসে যে অতীতটা ভালো ছিল। যে সময়টা চলে যায়, সেটাই ভালো মনে করে আনন্দ পায়। সত্যিটা যদিও তা নয়। বর্তমানটাই বাস্তব।
গত কিছু বছর ধরে শুনছি ‘আগের চেয়ে ভালো’! এ কথা দিয়ে আসলে কী বোঝানো হয়? ‘আগে’ মানে ‘কত আগে’? শায়েস্তা খাঁ’র আমল নিশ্চয়ই নয়। আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভবত ‘আগে’ বলতে ২০০১ থেকে ২০০৬’র বিএনপি- জামায়াত এবং ২০০৭-০৮ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালকে বোঝাচ্ছে। বা তার আগের অন্যান্য সরকারের সময়কেও বুঝিয়ে থাকতে পারে।
সেই সময়কালের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের দুই মেয়াদের গত আট সাড়ে আট বছরের সময়কাল নিয়ে কিছু তুলনামূলক আলোচনা করা যেতে পারে।
১. ‘আগে’র চেয়ে মানুষের আয় বেড়েছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বাজেটের আকার বিশাল হয়েছে। নতুন রাস্তা না হলেও, কিছু রাস্তা চারলেন হয়েছে, হচ্ছে, কিছু সেতু হয়েছে, পদ্মা সেতুসহ আরও কিছু ছোট- বড় সেতুর নির্মাণ কাজ চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে খাদ্য উৎপাদন। এসব ক্ষেত্রসহ নিশ্চয় আরও কিছু ক্ষেত্রে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, অন্য যেকোনও সরকারের যেকোনও কাজের চেয়ে ভালো কাজ।
২. আগে মোটা চালের কেজি ছিল ২২ টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দাম বেড়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার কারণে। তখন মোটা চালের কেজি হয়েছিল ৩৬- ৪০ টাকা। ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারও নিয়ন্ত্রণে আসে। দেশে মোটা চালের কেজি নেমে আসে ২৬ টাকায়। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মোটা চালের কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে থাকে। ২০১৭ সালে এসে দাম বাড়তে বাড়তে ৫৫ টাকা হয়।
মোটা চাল ক্রেতাদের আয় ২০১৬ সালে যা ছিল, ২০১৭ সালেও তাই আছে। কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৪ টাকা।
মধ্যবিত্তের আয় এবং চালের দামের হিসেবটাও এমনই। শুল্ক কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির পর দাম কেজিতে ৬ টাকা কমবে, জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ৫০-৫৫ টাকার চাল ৬ টাকা কমে হবে, ৪৬-৪৯ টাকা কেজি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ চালের দামের ক্ষেত্রে কী, তা বলার সুযোগ আছে!
২. চালের মজুদ ‘আগে’ থাকতো কমপক্ষে ৬ লাখ মেট্রিক টন। তা কমে হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। চিত্রটা যে ‘আগের চেয়ে ভালো’ নয় বাজারই তো বলছে।
৩. খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এবার আমদানি করা চাল- গমের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এই খাদ্যমন্ত্রী ‘আগে’ পোকায় খাওয়া মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত গম আমদানি করেছিলেন। তার জন্যে কোনও শাস্তি পেতে হয়নি তাকে।
এবার যদি সত্যি পচা গম- চাল আমদানি করা না হয়, তাহলে বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’!
৪. বাংলাদেশে তো নয়ই, সারা পৃথিবীর কোথাও আজ পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচ হয়নি। বাংলাদেশে হচ্ছে। প্রতি কিলোমিটারে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ সাধারণ বিষয়!
যেখানে কিলোমিটার প্রতি ভারতে খরচ ১১-১৩ লাখ, চীনে ১৩-১৬ লাখ, ইউরোপ- উত্তর আমেরিকায় ৩৫ লাখ টাকা।
এত টাকা খরচ করে বাংলাদেশে ‘আগে’ কখনও রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি।
পদ্মাসেতুর বাজেট ছিল ৮ হাজার কোটি টাকা। এখন ২৮ হাজার কোটি টাকা। আরও কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মাসেতু। ৩৫০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার ১২৫০ কোটি টাকাতেও শেষ হচ্ছে না।
তবুও বলব ‘আগের চেয়ে ভালো’!

৩. ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। এখন উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট বলা হলেও, উৎপাদন ৭৫০০ থেকে ৮৫০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণ। পরিস্থিতি ‘আগের চেয়ে ভালো’।

দাম বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেওয়া লুটপাটের রেন্টাল- কুইক রেন্টাল নীতিতে চলেছে সরকার। তেলের দাম, ক্যাপাসিটি ট্যাক্স, অধিক মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা- সব ক্ষেত্রে নজীরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বিএনপি- জামায়াত সরকারের সময়ে ‘খাম্বা দুর্নীতি’ ছিল তুমুল আলোচিত- সমালোচিত বিষয়। রেন্টাল- কুইক রেন্টালের দুর্নীতির কাছে, যা কিছুই না।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৯ সাল থেকে কমতে শুরু করেছে। ২০০৭-০৮ সালে যে তেলের দাম ছিল ১২০ ডলার, ২০১৬ সালে তা ৩০ ডলারে নেমে এসেছিল। দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি। তেলের দাম কমার সুফল সরকার পেয়েছে, জনগণ পায়নি। সরকার আর জনগণ আলাদা হয়ে গেছে, অদ্ভুত শোনালেও অসত্য নয়।

উৎপাদন এবং লোডশেডিং বিবেচনায় অবশ্যই বলা যায় ‘আগের চেয়ে ভালো’। দাম, অনিয়ম- দুর্নীতি বিবেচনায় বলতে হবে ‘আগের চেয়ে বেশি অনেক বেশি, আগের চেয়ে ভালো নয়।’

৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে ভালো যোগ্য মানুষ আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তারা ভালো কাজ আগেও করতেন, এখনও করেন। অন্যায়- অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আগেও ছিল, এখনও আছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটাতেন, এখনও ঘটান।
আগে কখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নামে অপহরণ- গুমের ঘটনা এত ঘটেনি, এখন যত ঘটে। আগে শেখ হাসিনার জনসভায় পুলিশ গুলি করে ২৫/৩০ জন মানুষকে হত্যা করেছে। পেট্রোল বোমার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছে। সন্ত্রাসও আগের চেয়ে বেশি হয়েছে, মানুষ হত্যাও বেশি হয়েছে। তবে র‌্যাব কয়েকজন সদস্য কর্তৃক সাত জনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। পুলিশ মানুষের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে, এমন প্রমাণ আগে কখনও পাওয়া যায়নি। অপহরণকারী মাইক্রোবাসের পেছনে পুলিশের গাড়ি আগে কখনও দেখা যায়নি। গ্রেফতার করার কয়েক মাস পর ‘আজ গ্রেফতার’ দেখানোর অভিযোগ অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বহুগুণ বেশি। জঙ্গি পালনের অভিযোগ আগে ছিল, হলি আর্টিজানের আগে পর্যন্ত জঙ্গি জিইয়ে রাখা, আইএস- আল কায়েদা আছে প্রমাণ করার চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। কোনও বিবেচনায় বলা যাবে ‘আগের চেয়ে ভালো’?

৫. লক্ষ কোটি টাকার ওপরে খেলাপি ঋণ আগে কখনও হয়নি। আর্থিক খাতে ‘পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি’’র ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এতটা রুগ্‌ণ অবস্থা আগে কখনও হয়নি। আগে কখনও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়নি। সুইজ ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা আগে কখনও দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়নি। ড. আতিউর রহমানের মতো এতটা এমন গভর্নর আগে কখনও দেখা যায়নি। ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার কোনও সুযোগ তো দেখি না!
৬. বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। দেশীয় অর্থে বাজেট, নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নিয়ে কথার শেষ নেই। এখন বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ যে ৪০ হাজার টাকা, সে কথা বলতে শোনা যায় না। ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৬ হাজার টাকা, সে কথাও ‘উন্নয়ন’র গল্প বলাওয়ালারা বলেন না।
ঋণের পরিমাণ ‘আগের চেয়ে বেশি’ আর ‘আগের চেয়ে ভালো’ নিশ্চয় এক অর্থ বহন করে না!
৭. এরশাদ আগে কখনও ক্ষমতা দখল করার পক্ষে এভাবে কথা বলতে পারেনি। ‘ আমি ক্ষমতা নিতে চাইনি, বাধ্য হয়ে নিয়েছি’ এত বড় অসত্য সংসদে দাঁড়িয়ে বলেনি। রাজনীতিবিদদের জন্যে অত্যন্ত অসম্মানজনক অসত্য বলার পরও সংসদে কেউ প্রতিবাদ করেননি। পতিত স্বৈরাচারের এমন আস্ফালন আগে কখনও দেখা যায়নি।
এটাকে কী ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলবেন?
৮. বিনা ভোটের ‘হ্যাঁ – না’ নির্বাচনসহ এদেশের মানুষ ভোটারবিহীন নির্বাচন অনেক দেখেছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন, যে নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত, এমন নির্বাচন আগে কখনও দেখেননি।
সংবিধান রক্ষার নামে ভোটার বিহীন নির্বাচনের কথা আগেও বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বলা হয়েছে, এখনও বলা হচ্ছে।
কোনও বিবেচনাতেই এই নির্বাচনকে ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলার সুযোগ নেই।
৯. সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়মিত ফাঁস আগে কখনও হয়নি। নির্দেশ দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আগে কখনও ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ৯০% -৯৫% শিক্ষার্থীর পাস নম্বর না পাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি। পাঠ্য পুস্তক এমন সাম্প্রদায়িকরণ কোনও সামরিক সরকারও করেনি। বিএনপির জামায়াত, আওয়ামী লীগের হেফাজত পৃষ্টপোষকতা- কোনটাকে ভালো বা কম খারাপ বলবেন?
শিক্ষা ব্যবস্থার এমন করুণ পরিণতিকে নিশ্চয় ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না!
১০. কৃষক খাদ্য উৎপাদন বিরতিহীনভাবে বৃদ্ধি করছে। এখানে সরকারের খুব বেশি কোনও কৃতিত্ব নেই। কৃষককে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার দায়ে অভিযুক্ত সবগুলো সরকার। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সরকারের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ থাকে। সাম্প্রতিক হাওর এবং পাহাড়ের দুর্যোগে নজীরবিহীন অযোগ্যতা, দায়- দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। অন্য সরকারকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের অতীতের সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে, বর্তমান অন্ধকার।
২০-২৫ লাখ মেট্রিক টন চাল যে বছর আমদানি করা হয়, সে বছরই ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রফতানি করা হয়। চাল উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, রফতানিকারকও কৃতিত্ব নেওয়ার এই চালাকিকে আর যাই হোক ‘আগের চেয়ে ভালো’ বলা যায় না।
১১. তাহলে ‘আগের চেয়ে ভালো’ কী? ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের হিসেব ‘আগের চেয়ে ভালো’। মূল্যবৃদ্ধির অসহনীয় প্রভাবে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্ক জনজীবনে কোনও সুফল বয়ে আনতে পারছে না। সন্দেহ তৈরি হচ্ছে ‘প্রবৃদ্ধি’র অঙ্কের মারপ্যাঁচ নিয়ে। উৎপাদন বৃদ্ধির কৃতিত্ব কৃষকের, রিজার্ভ বৃদ্ধির কৃতিত্ব নিজ উদ্যোগে বিদেশে যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের। তারাও কৃষক, কৃষকেরই সন্তান। কৃষি উপকরণ সরবারাহে সরকারের কিছুটা কৃতিত্ব থাকলেও, প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনও কৃতিত্ব নেই, উল্টো দায় আছে অনেক।
আগের মত সরকার বিরোধী আন্দোলন নেই। শত অন্যায়ের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয় না। রামপালবিরোধী আন্দোলনসহ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার যেকোনও আন্দোলন দমন করা হয় আগের চেয়ে অনেক গুণ কঠোরভাবে। বুদ্ধিজীবীরা বিবেক বিক্রি করে আকসকামিতা- তোষামোদীতে আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ফলে হাজারও জনবিরোধী নীতি নিয়েও সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সমস্যা হচ্ছে না।
‘আগের চেয়ে ভালো’- তেমন কিছুর সন্ধান পাওয়া না গেলেও, ক্ষমতায় টিকে থাকা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

এ জাতীয় আরও খবর